
শেখ সাইফুল ইসলাম কবির
“পাখি আকাশে উড়িয়া বেড়ায়, দেখিয়া হিংসায়, পিপীলিকা বিধাতার কাছে পাখা চায়।”
এই কথাটির মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক সত্য লুকিয়ে আছে। প্রত্যেকেই চায় উন্নতি করতে, উঁচুতে উঠতে, নিজের জীবনকে আরও সুন্দর করে গড়ে তুলতে। কিন্তু কিছু মানুষের মন এতটাই পরশ্রীকাতরতায় ভরে যায় যে তারা অন্যের সফলতা দেখে ঈর্ষায় জ্বলে ওঠে। তখন তারা নিজের কাজ ভুলে, নিজেকে গড়ার বদলে, কেবল অন্যকে নিচে নামানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটি একপ্রকার মানসিক ব্যাধি — যার নাম “পরশ্রীকাতরতা”।
পরশ্রীকাতরতা কী?
পরশ্রীকাতরতা মানে হলো — অন্যের মঙ্গল, উন্নতি বা সাফল্য দেখে মনোকষ্ট পাওয়া বা ঈর্ষা করা। এটা এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের জীবনের অগ্রগতি না দেখে, কেবল অন্যের সুখ-সাফল্যে বিরক্ত ও হতাশ হয়। এর ফলে সে নিজের জীবন থেকে বঞ্চিত হয় উন্নতি, শান্তি ও সাফল্য থেকে।
এই রোগের লক্ষণ
১. অন্যের সাফল্য দেখলে অস্থিরতা অনুভব করা।
২. নিজে ব্যর্থ হলেও অন্যের ব্যর্থতায় আনন্দ পাওয়া।
৩. সামাজিক মাধ্যমে অন্যের ভালো খবর সহ্য না হওয়া।
৪. সর্বদা অন্যকে কটাক্ষ করা, খোঁটা দেওয়া।
৫. নিজের ব্যর্থতার জন্য অন্যকে দায়ী করা।
এই ব্যাধির কারণ কী?
এই রোগের প্রধান কারণ হলো আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং আত্মসম্মানের ঘাটতি। যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, নিজের লক্ষ্যে স্থির নয়, সে-ই পরশ্রীকাতর হয়। সমাজে চলতে গিয়ে অনেক সময় তুলনামূলক মানসিকতা তৈরি হয় — “সে এগিয়ে যাচ্ছে, আমি পারছি না কেন?” — এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় হিংসা, এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পরশ্রীকাতরতা।
এই রোগের পরিণতি
পরশ্রীকাতর ব্যক্তি কখনই সুখী হতে পারে না। সে সবসময় অশান্তিতে ভোগে। তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে, সম্পর্ক নষ্ট হয়, এবং সামাজিকভাবে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, সে নিজের উন্নতির পথ হারিয়ে ফেলে।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
পরশ্রীকাতরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. আত্মবিশ্বাস বাড়ানো – নিজের সামর্থ্যে বিশ্বাস রাখতে হবে।
২. নিজের লক্ষ্যে মনোযোগী হওয়া – অন্যকে দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে নিজের পথ বেছে নিতে হবে।
৩. আত্মসমালোচনা ও আত্মউন্নতি – নিজের ভুল চিনে নিয়ে তা সংশোধন করতে হবে।
৪. ধ্যান ও মানসিক প্রশান্তি চর্চা করা – মনের শান্তির জন্য ধ্যান, বই পড়া, ভালো গান শোনা ইত্যাদি উপকারী হতে পারে।
৫. পেশাদার সহায়তা নেওয়া – যদি পরিস্থিতি খুব খারাপ হয়, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
উপসংহার
পরশ্রীকাতরতা এমন একটি মানসিক ব্যাধি, যা সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের উন্নয়নে বড় বাধা। এই রোগে ভোগা মানুষ নিজেকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। তাই প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে, নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত না হয়ে অনুপ্রাণিত হতে শিখতে হবে। তাহলেই সমাজ হবে সুন্দর, সম্পর্ক হবে সুস্থ, এবং ব্যক্তি জীবনে আসবে সত্যিকারের শান্তি ও সাফল্য।
শেখ সাইফুল ইসলাম কবির চেয়ারম্যান জাতীয় মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম কেন্দ্রিয় কমিটি ঢাকা।