
মানবিক বিশ্ব গড়ার বড় চ্যালেঞ্জ কাঁধে নিয়ে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশ্ব। জলবায়ু সংকট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে গাজার মানবিক বিপর্যয়, এমন বহুমাত্রিক সংকটের মেঘ যখন বিশ্বজুড়ে, তখনই শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের বার্তা নিয়ে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশন। ‘একসঙ্গে ভালো: শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের পথে ৮০ বছর এবং আরও বেশি’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক মঞ্চে মিলিত হবেন ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা।
এই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জোরালো আহ্বান থাকবে বলে জানা গেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় হতে জানা গেছে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর ড. ইউনূস নিউইয়র্কে পৌঁছাবেন এবং ২৬ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। তার ভাষণে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সংস্কার, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় এবং সাবেক স্বৈরাচারী শাসন-পরবর্তী বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি তার ভাষণে উঠে আসতে পারে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু, অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়।
জানা গেছে, জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে ড. ইউনূস এবং বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেখানে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকগুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে। এসব বৈঠকে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিবেশ এবং সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরবেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বাংলাদেশকে একটি বিনিয়োগ-বান্ধব দেশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ড. ইউনূসের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘ ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আয়োজন করছে। এই সম্মেলন থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একটি কার্যকর ও সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ২৬ সেপ্টেম্বর সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কক্সবাজারবাসীর একটি মাত্র দফা, সেটা হচ্ছে বিনাশর্তে সব রোহিঙ্গার নিজ মাতৃভিটায় প্রত্যাবাসন করা। তা না হলে রোহিঙ্গাদের বোঝা শুধু কক্সবাজারবাসীদের কাঁধে না ঝুলিয়ে জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের মধ্যে আনুপাতিক হারে অভিবাসন করা। বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ গরিব দেশে এতো বড় বোঝা একা বইবে কেন? যদি এ কাজ করতে ব্যর্থ হন তবে দেশে এসেই বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় আনুপাতিক হারে পুনর্বাসন করুন—এই এক দফা ব্যতীত কোন দফা আমরা বুঝতে চাই না। যার জ্বালা সেই বুঝে। কক্সবাজারবাসী বুঝে রোহিঙ্গা আপদের বিষ-জ্বালা।
সরকার যেন আবারো দেশের নিরাপত্তাবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন। ১৮ কোটি লোকের ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাময় ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সিদ্ধান্তটি যে ছিল চরম আত্মঘাতী—তা আজ ধীরে ধীরে প্রমাণিত হচ্ছে। নোয়াখালীর ভাসানচর দ্বীপটি জেগে উঠেছে বেশি দিন হয়নি। যেখানে হঠাৎ করে বিপুল মানুষের পুনর্বাসনে কক্সবাজারের বর্তমান অবস্থার চেয়ে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ—তা প্রমানিত হয়েছে। দ্বীপটির চারদিকে প্রতিবছর নতুন ভূমিও গড়ে উঠছে, যা এর স্থায়িত্ব ও সুরক্ষার জন্য ইতিবাচক। ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত স্থানান্তর-প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। শরণার্থীদের কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে পাঠানো এ ক্ষেত্রে স্ববিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করে কি না, সেটা ভাবা দরকার। বর্তমানের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ‘উন্নত’ এবং স্থায়ী পরিসরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা মাত্রই মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের গ্রহণ এবং পুনর্বাসনে নিশ্চিতভাবে নিরুৎসাহ দেখাবে। বাংলাদেশের পুনর্বাসন উদ্যোগ মিয়ানমারের ওই প্রচারণাকেও শক্তি জোগাবে, ‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেরই নাগরিক’। ভাসানচরে পুনর্বাসিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ প্রশাসনের জন্য স্থায়ী বোঝায় পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় দস্যুতার যে প্রকোপ, তা আরো বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের যদি পাশের জলরাশিতে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে তাদের ওপর নজরদারিও দুরূহ হবে। সেক্ষেত্রে মানব পাচার আরও বেড়ে যেতে পারে এবং তার কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ দোষারোপের শিকার হতে পারে। এরূপ স্থানান্তর নিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের মতদ্বৈধতা তৈরি হলে তা বড় ধরনের নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ভাসানচরের সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা পালানো শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে পুলিশের হাতে বেশ কয়েকজন ধরা পড়েছে। কক্সবাজারের তুলনায় উন্নত বাসস্থান আর সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে। তা সত্ত্বেও ভাসানচর থেকে থেকে বেশ কিছুদিন ধরে রোহিঙ্গারা দলে দলে কক্সবাজারে পালাতে শুরু করেছে। যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকির কারণ।
আমাদের দাবি, রোহিঙ্গাদেরকে শুধু উখিয়া ও টেকনাফে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় সংখ্যানুপাতে ভাগ করে দেয়া হোক। বাংলাদেশের সীমান্তে এক কিলোমিটারের মধ্যে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা রাখাতে যেকোনো মুহুর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দেশের বৃহৎ স্বার্থে রোহিঙ্গাদেরকে এক যায়গায় না রেখে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছিটিয়ে দিলে রোহিঙ্গা অপরাধ কমানো সম্ভব হবে। তা না হলে রোহিঙ্গারা একত্রিত হয়ে যে কোন সময় যে কোন মুহুর্তে দেশের বড় ধরনের ক্ষতিসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটানোর সম্ভাবনা আছে। তবে রোহিঙ্গাদেরকে ভাসান চরের মত সম্ভাবনাময় যায়গায় না নেওয়া উত্তম।
গণমাধ্যমে জেনেছি, এই সফরে ড. ইউনূসের সঙ্গে থাকছেন দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। আগামী দিনে দেশের শাসন ক্ষমতার আসীন হবার অন্যতম দাবীদার জাতীয় নেতৃবৃন্দের সহায়তা আপনার কাজকে বেশী কার্যকর করবে বলে আমার বিশ্বাস। এক অস্থির সময়ে বিশ্বনেতারা যখন মিলিত হচ্ছেন, তখন তাদের কাছ থেকে দৃঢ় পদক্ষেপ এবং সম্মিলিত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই হবে এবারের অধিবেশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এমনটা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিপুল জনসংখ্যার চাপে আশ্রয়দাতা বাংলাদেশও রয়েছে বিপদে। রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে; সামাজিক অসন্তোষ বাড়ছে; রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এর আশপাশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। বিশেষত, মাদক, অস্ত্র ও মানব পাচারের মতো ভয়ংকর সমস্যাগুলোর বিস্তার ঘটছে। যতই দিন যাবে, এসব সমস্যা ততই জটিল হবে এবং বৃদ্ধি পাবে। এ কারণেই রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধান ও তাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এ জন্য প্রয়োজন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে মরীচিকা বা কল্পকথার বদলে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের আওতায় এনে সফল করার চেষ্টা চালানো।
এদিকে আরেকটি গোষ্ঠী মিয়ানমারে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের মধ্যে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠী সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। কিন্তু বিতাড়িত রোহিঙ্গারা এ আন্দোলন বা সশস্ত্র লড়াইয়ে অনুপস্থিত। কখনো তাদের কিছু অংশ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কিংবা আরাকান আর্মির পক্ষে লড়াই করেছে। কোনো কোনো গ্রুপ চাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে সশস্ত্র পথে আরাকানের মাটি ফিরে পেতে। তারা স্লোগান দিয়েছে, ‘ভিক্ষা চাই না, মাটি চাই।’ এ প্রচেষ্টার সঙ্গেও দেশি-বিদেশি রোহিঙ্গা নেতারা সংশ্লিষ্ট রয়েছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন নিজেদের অধিকার নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া, বাংলাদেশের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও অন্যান্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি টেকসই প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা। প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হলে নানা রকমের নতুন সমস্যা ও ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেসব সমস্যা বাংলাদেশকেই এককভাবে সামাল দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের কারণে বর্তমানে যে মানবিক, আর্থিক, সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যা চলছে, সামনের দিনগুলোতে এর সঙ্গে যদি রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যা যুক্ত হয়, তা বাংলাদেশের জন্য বিরাট বিপদ তৈরি করবে। পাশেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অস্থির এবং নানাবিধ সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের কারণে নাজুক। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ঘিরে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সমস্যার সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
অতএব, রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়টি কেবল মানবিক ত্রাণ সহায়তার পরিসরে দেখার অবকাশ কম। দূরদৃষ্টিতে নিয়ে দেখলে বুঝা যায়, এ সমস্যার দীর্ঘসূত্রতা ও বিস্তারের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি ও বিভিন্ন মাত্রার চ্যালেঞ্জও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কাজেই প্রত্যাবাসন কেবল রোহিঙ্গাদের জন্যই নয়, বাংলাদেশের জন্যও স্বস্তিদায়ক বিষয়। এক অস্থির সময়ে বিশ্বনেতারা যখন এক ছাদের নিচে মিলিত হচ্ছেন, তখন তাদের কাছ থেকে দৃঢ় পদক্ষেপ এবং রোহিঙ্গা সংকট সম্মিলিত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই হবে এবারের অধিবেশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এমনটা মনে করছি।
লেখক: মহাসচিব, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি, চেয়ারম্যান, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, উখিয়া, কক্সবাজার।