রকি আক্তার
একজন মানুষের জীবনে অনেকগুলো ধাপ থাকে, প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য আবেগ। এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে পদার্পণের মুহূর্তে আগের ধাপের প্রতি জন্ম নেয় অগাধ মায়া ও টান।
আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের প্রথম ধাপ শুরু হয়েছিল আমাদের গ্রামের গোয়ারা পাথারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইটনা, কিশোরগঞ্জে। সেই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো স্মৃতির বন্ধন—শৈশবের হাসি-খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ-উল্লাস। আর শিক্ষাজীবনের পর চাকরিজীবনের সূচনাও হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান থেকেই। শিশুশিক্ষার মহৎ ব্রত নিয়ে পথচলা শুরু করি এখানেই।
শুধু একজন শিক্ষক হিসেবেই নয়, এলাকার কন্যা ও অত্র বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে কোমলমতি শিশুদের জন্য সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। শিক্ষার্থীদের হাসি-খুশি মুখ দেখলেই আমিও ফিরে যেতাম আমার ছোটবেলায়। সুযোগ পেলে তাদের খেলায় যোগ দিতাম, ইউটিউব বা নানা উপায়ে নতুন খেলার আইডিয়া এনে তাদের সঙ্গে মেতে উঠতাম। তখন মনে হতো—এই আনন্দই আসল পুরস্কার।
কিন্তু জীবনের নিয়মেই বিদায় এলো। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে আমাকে বদলি হয়ে যোগ দিতে হয়েছে ১ নং রায়টুটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইটনা, কিশোরগঞ্জে। বিদায়ের সেই মুহূর্ত ছিল অতি বেদনাদায়ক। আগের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে আমাকে দেখতে এলো। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে গলা আটকে গেল, শব্দগুলো এলোমেলো হয়ে গেল, হাজারো বাক্য মাথায় ঘুরলেও আমি ভুগলাম শব্দহীনতায়। হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেল। গতকাল এক শিক্ষার্থী হাত ধরে মিনতি করে বলল— “প্লিজ ম্যাম, আজকে আমাদের স্কুলে চলে আসেন।” বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। কিছুই বলতে পারলাম না। নীরবতাই ছিল আমার উত্তর, কিন্তু সেই নীরবতাই তাদের চোখে জল এনে দিল।
ভাবতে থাকি—তারা কি টের পেয়েছিল আমার চোখের জল লুকানোর সেই কষ্ট?
ইচ্ছে থাকলেও তাদের মতো অবাধে আবেগ প্রকাশ করতে পারিনি।
হ্যাঁ, এই বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীরা আমার জীবনের এক বড় আবেগের জায়গা।
ভালো থেকো তোমরা, ভালো থেকো আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান।
দেখা হবে কখনো কারণে, কখনো অকারণে।
সবশেষে সবার কাছে দোয়া চাই—
নতুন কর্মস্থলেও যেন নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারি।