লেখক: সাবিত রিজওয়ান
মনে হচ্ছে আজ রোদের মুখ দেখায় যাবে না, চারদিকেই উড়ছে কুয়াশা। বাড়ি থেকে একটু দূরে রাস্তা। একটা ট্রাক্টর যাচ্ছে, স্পষ্ট দেখা না গেলেও অনুভব করা যায়। "উহ্ ঠান্ডা, আজ সকাল সকালেই উঠতে হলো" বিরবির করতে রহমত আলী হাতে নিল ব্রাশ, পকেটে ফোনে ছাড়ল এফ.এম রেডিও। হাঁটা ধরল পাকা রাস্তা দিয়ে খালিশপুরের ব্রিজে যাবে, এবং আবার ব্রিজ থেকে বাড়ি যাবে — এটাও একপ্রকার ব্যায়াম।
রাস্তায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। রেডিও থেকে কেউ শীত সম্পর্কে কথা বলছে। যেমন— “ঠান্ডায় মানুষ হাইপোথারমিয়া, ঠান্ডাজনিত নিউমোনিয়া, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি, ঘন কুয়াশা—দুর্ঘটনা… এসব হয়ে মারা যাচ্ছে। তাই আপনারা সতর্ক থাকুন, গরম কাপড় পরুন। যদিও জীবন-মরন আল্লাহর হাতে, তবুও সাবধানতা আমাদের দায়িত্ব।”
পানি হিম হয়ে আছে, যেন বোলায় যাচ্ছে না। মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ফেলাও বোঝা যায়। রেডিও শোনার মনোযোগে পৌঁছে গেল ব্রিজে। বুঝতেই পারছে না, মনে হলো এইতো কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি থেকে বের হলাম। ব্রিজের নিচের দিকে তাকাতেই তিনি দেখতে পেল জেলেরা জাল খেয়াচ্ছে। বাতাস বইছে, জেলেরা তবু মাছ ধরার মনোযোগে।
সামনের দিক থেকে একজন সাইকেলে চড়ে এসে দাঁড়াল ব্রিজে। লোকটা ব্রিজের নিচে তাকাতে তাকাতে দেখল—তুফান ও আরও কয়েকজন জাল খেয়ে এনে এখন মাছ ধরছে। লোকটা তুফানকে চিৎকার করে বলল, “কিরে, তোর কি বাঁচার ইচ্ছে নেই?”
তখন কোনো উত্তর আসলো না। যে সময় অন্যরা গায়ে ল্যাপ মুড়িয়ে শুয়ে থাকে সে সময় জেলেরা পানিতে—জেলেদের কি জীবনের মায়া নাই?
জেলেরা মাছ ব্রিজে তুলল। রহমত জেলেদের কাছে গেল এবং একটি ছেলেকে দেখতে পেল—ছেলেটা হচ্ছে তুফান। হুট করে রহমতের মনে পড়লো, এই ছেলেটা না বাজারে আইসক্রিমও বেচতো!
সাইকেলওয়ালা লোকটা এক কেজি মাছ কিনল। রহমত তুফানকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা ভাই, কদিন আগেও তো জাল খেয়ানি হয়েছিল, এই তো তিনদিন হবে। এত ঘনঘন খেয়ালে মাছ পাওয়া যায়?”
তুফান বলল, “ভাই, আমি তো এর আগে আসিনি, তবে এটা নাকি রশিদুল ভাইয়েরা কন্টাক্ট নিছে (নদীর অংশে মাছ চাষের অনুমোদন), তার মেয়াদ নাকি শেষ হতে যাচ্ছে।”
রহমত আবার জিজ্ঞেস করল, “তোমায় তো দেখেছিলাম আইসক্রিম বিক্রি করতে।”
তুফান নিচু স্বরে বলল, “কি আর করব ভাই… বেঁচে থাকতে হবে। জানি একদিন মরন আসবে। দেখি অনাহারে না মরে একটু খেয়েই মরতে পারি কি-না।”
এই কথাগুলো রহমত আলীর বুক কেমন যেন টনটন করে উঠলো। তাঁর মনে হলো— জীবনটা সংগ্রামে ভরা; যে জীবনে দুঃখ নেই, সে কখনো সুখের স্বাদ বোঝে না।
তিনি ব্রিজের ধার থেকে নদীর দিকে তাকালেন। তীব্র ঠান্ডা, ঘন কুয়াশা, তবু জীবন থেমে নেই। কাজী নজরুল ইসলামের লাইনটি যেন তাঁর ভেতর ধ্বনিত হলো— “কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে…”
এই গল্পের মোঃ রহমত আলী একজন ভাবুক মানুষ— আর হ্যাঁ, তিনিও একজন কবি। নদীর তীব্র ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে জেলেদের সংগ্রাম দেখে তাঁর কলম যেন আবার জেগে উঠল।
তিনি বুঝলেন— মানুষের চোখে যে কষ্ট, সেটাই কবির কবিতার আলো।
এই গল্পটি লেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন আহমেদ হোসাইন ছানু ভাই। তাঁর উৎসাহেই গল্পটি লিখলাম।