স্টাফ রিপোর্টার:
রোহিঙ্গা ইস্যু একটি কঠিন ও জটিল সমস্যা। দিন যত গড়াচ্ছে ততই যেন এর সমাধানের পথ দূরে সরে যাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গারা ফেরত না গেলে আগামী ৫-৭ বছরের মাথায় এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য কতখানি হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। যদি উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে থাকা ১৪ লাখ রোহিঙ্গার জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, তাহলে রোহিঙ্গ সংকট আরও বেড়ে যাবে। তখন রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে চাইবে না, প্রত্যাবাসন আরও বিলম্বিত হবে। কক্সবাজারের নিরাপত্তা ও পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা করতে হলে রোহিঙ্গার জন্য স্থায়ী ঘরবাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে। আট বছর আগে ১৪ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয়শিবির নির্মাণ করতে গিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ১০ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। এতে জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি ভূমিধসের সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়গুলোতে বড় বড় ফাটল ধরেছে। চাহিদার অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভের পানি ক্রমান্বয়ে নিচে চলে যাচ্ছে। খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বনাঞ্চল উজাড়, অভয়ারণ্য ও জলাশয় ধ্বংসের কারণে ৫০টির বেশি বন্য হাতিসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী খাদ্যসংকটে ভুগছে। নাফ নদীর পানি দিয়ে রোহিঙ্গাদের খাওয়ার পানির চাহিদা পূরণে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ, বিদেশি সহায়তার ৩৭৫ কোটি টাকায় আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও এনজিওদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে এই রোহিঙ্গারা জীবনেও মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হবে না। তা ছাড়া স্থায়ী অবকাঠামো কীভাবে নির্মাণ হবে, কোথায় নির্মাণ করা হবে, নকশা কী রকম হবে তাও গোপন রাখা হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় আধিপত্যবাদ বিরোধী জনতার মঞ্চ কর্তৃক বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা একথা বলেন। আধিপত্যবাদ বিরোধী জনতার মঞ্চ সমন্বয়ক মোহাম্মদ আতা উল্লাহ খান এর সঞ্চালনায় ও সংগঠনের প্যানেল চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোহাম্মদ নাঈম হাসান এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলামিস্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রোকন উদ্দিন। গোলটেবিল বৈঠকে মূলপ্রসঙ্গ উপস্থাপন করেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটির মহাসচিব ও পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন প্যানেল চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এম. এ. ইউসুফ।
জাতীয় গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন, জাতীয় পর্যবেক্ষক পরিষদের সভাপতি রেহানা সালাম, মানবাধিকার কর্মী ও কলামিস্ট এ এইচ এম ফারুক, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আক্কাস আল মামুন ভূঁইয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনির, মহাসচিব মো. আলমগীর কবির, সহ-সভাপতি আব্দুল হামিদ রানা, ইসলামিক বুদ্ধিজীবী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান শাহ সুফি ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আব্দুল হান্নান আল হাদি, আগ্রাসন প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক আন্দোলনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা শওকত আমিন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মাহবুব হোসেন, লেবার পার্টির মহাসচিব কবি আব্দুল্লাহ আলমামুন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির যুগ্ম মহাসচিব নারীনেত্রী মিতা রহমান, কবি ও আবৃত্তিকার সালমা শারমিন, বিথি মোস্তফা, জামাল উদ্দিন শেখ, পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিষদের সহ-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাসুম রানা, মুফতি আবুল খায়ের, সহ আরও অনেকে।
বৈঠকে বক্তারা রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি, মাদক ও মানবপাচার, স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থায় দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা জোরদার, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, রোহিঙ্গারা আশ্রয় শিবিরে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের কারণে হতাশা, ক্ষোভ ও ভবিষ্যৎহীনতা দেখা দিতে পারে, যা সমাজ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এছাড়াও, রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাদক, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায় এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গারা মাদক ব্যবসায়, মানবপাচার ও অবৈধ অস্ত্রের কারবারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। প্রভাবশালী ও অসাধু ব্যক্তিদের সহায়তায় রোহিঙ্গারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাচ্ছে, যা দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠনের মাধ্যমে আসা অস্ত্র-গোলাবারুদ দেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গি সংগঠন ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের হাতে যাচ্ছে, যা জাতীয় নির্বাচনের সময় চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বক্তারা আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে বর্তমানে যে মানবিক, আর্থিক, সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যা চলছে, সামনের দিনগুলোতে এর সঙ্গে যদি রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যা যুক্ত হয়, তা বাংলাদেশের জন্য বিরাট বিপদ তৈরি করবে। পাশেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অস্থির ও নানাবিধ সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের কারণে নাজুক। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ঘিরে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সমস্যার সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান না হলে দ্রুতই এই সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকির কারণ হতে পারে।