
কলমেঃ ইরি অতনু
যশোর শহরের সেই পুরনো টিনশেড বাসাটার বারান্দায় বসে যখন অভি প্রথমবার অনুর হাত ধরেছিল, তখন ওদের চারপাশে ছিল কামিনী ফুলের গন্ধ। সেদিন অভি বলেছিল, “মানুষের জীবনটা তো আসলে একটা যাযাবর ডায়েরি, অনু। আমরা শুধু পাতা উল্টে যাই।” আজ পনেরো বছর পর, সিলেটের এক অভিজাত ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে বসে প্যাকিং বাক্সের স্তূপ দেখে অনুর মনে পড়ল অভির সেই কথাটি।
অভিনাভ আর অনিন্দিতা—একে অপরের ‘অভি’ আর ‘অনু’। ওদের বন্ধুত্বের শুরু স্কুলজীবনের সেই মফস্বল শহরে। কোচিং শেষে সাইকেলের চাকা ঘুরাতে ঘুরাতে ওরা স্বপ্ন দেখত এক স্থির জীবনের। কিন্তু উচ্চশিক্ষা ওদের টেনে নিয়ে গেল ভিন্ন শহরে। হোস্টেলের সেই ঘিঞ্জি ঘর, দেয়ালের নোনা ধরা রঙ—সেখানেই ওরা প্রথম শিখল মানিয়ে নেওয়া।
”যেখানে মায়া জন্মায়, সেখানেই বিচ্ছেদের বীজ বপন করা থাকে।”
ছাত্রজীবন শেষ হতেই শুরু হলো রুটিরুজির লড়াই। চাকরির প্রয়োজনে ছোট ছোট ব্যাগে সংসার গুছিয়ে ওরা শহর থেকে শহরে ঘুরেছে। কখনো ঢাকার ব্যস্ত নগরীর কোলে এক চিলতে বাসা, কখনো আবার উত্তরের কোনো শিল্পাঞ্চল। প্রতিবার নতুন বাসায় ওঠার সময় অনু জানালার পর্দা মেলাত নিজের পছন্দের রঙের, অভি নিজের হাতে দেয়ালের কোণে বুকশেলফটা বসাত। অথচ মাস কয়েক যেতে না যেতেই আবার বদলির নোটিশ!
বিয়ের পর যখন ওরা নিজেদের মতো করে সংসার সাজালো, তখন মনে হয়েছিল—এই বুঝি স্থিতি এল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অনু একবার আক্ষেপ করে বলেছিল, “অভি, আমরা তো দেয়ালগুলোতে পেরেক ঠুকে আমাদের স্মৃতি ঝোলাই, কিন্তু দেয়ালগুলো তো আমাদের নয়!”
অভি তখন একটু বড় পদে পদন্নোতি। এবার ওদের পাড়ি দিতে হবে ভিন্ন শহরে। আজ এই ফ্ল্যাটটি ছাড়ার দিনে অনু লক্ষ্য করল, ড্রয়িংরুমের দেয়ালের সেই কালচে দাগটা, যেখানে ওদের প্রথম সন্তানের উচ্চতা মাপা হয়েছিল।
যে পাশের বাসার আন্টি প্রথমদিন মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন, আজ তিনি জলভরা চোখে পিঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যে রাস্তাটা প্রথমদিন গোলকধাঁধা মনে হতো, আজ সেই রাস্তার প্রতিটা মোড় হাতের তালুর মতো পরিচিত। তবুও যেতে হয়। মানুষের জীবন যেন এক অস্থায়ী অট্টালিকা। আমরা অন্যের তৈরি ইটের কাঠামোকে নিজের ভালোবাসা দিয়ে ‘ঘর’ বানানোর চেষ্টা করি, অথচ দিনশেষে আমরা কেবলই ভাড়াটে।
গাড়িতে ওঠার আগে অভি অনুর কাঁধে হাত রেখে মৃদু স্বরে বলল, “কষ্ট হচ্ছে অনু? আসলে অভিজ্ঞতা আমাদের ধৈর্য্যশীল করে ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির ভারটা কমানোর কোনো কৌশল শেখায় না।” মানুষ তার সারা জীবন ব্যয় করে নিখুঁত এক আশ্রয়ের খোঁজে, অথচ সে ভুলে যায় তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়টি আসলে কোনো ইট-পাথরের অট্টালিকা নয়, বরং তা বয়ে বেড়াতে হয় নিজের মনের ভেতরে। সময়ের কালচক্রে স্থান পরিবর্তন হয়, মানুষ বদলায়, কিন্তু হৃদয়ের সেই অস্থায়ী অট্টালিকাটি আজীবন মায়ার চাদরে ঢাকা থাকে।