
কলমেঃ ডক্টর মোঃ বদরুল আলম সোহাগ
দিনটি ছিল সোমবার। গত ১৬ই ডিসেম্বর, ২০২৪ আমি তখন মক্কা শরীফে—আল্লাহর ঘরে একজন অতি সামান্য মেহমান। রাত আনুমানিক পৌনে তিনটার দিকে হোটেল থেকে (সেহেরি) খেয়ে গিয়ে কাবা ঘরে নফল তাওয়াফ শুরু করি। তাওয়াফ শেষে তাহাজ্জুদের আজান হয়—যে আজান কেবল বাইতুল্লাহর প্রাঙ্গণেই দেওয়া হয়। সেই পবিত্র ডাকে সাড়া দিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করি।
ফজরের আজানের পর মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে জামাতের সাথে ফজরের নামাজ পড়ি। তারপর কাবা ঘরের সামনেই ইশরাকের সালাত আদায় করে হোটেলে ফিরে আসি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম, গোসল—তারপর আবার যোহরের সালাত আদায়ের জন্য হারাম শরীফে যাই। যোহর শেষে হোটেলে ফিরে এসে বিকেল তিনটার দিকে এহরামের কাপড় পরিধান করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসরের নামাজের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
পরিবারের অন্যরা হারামের বাইরে আসরের নামাজ আদায় করলেও আমি কাবা ঘরের সামনে, মাকামে ইব্রাহিমের নিকট নামাজ পড়ি। নামাজ শেষ হতেই শুরু হয় প্রচণ্ড ভিড়। এমন ভিড় যে, বাইরে বের হওয়া তো দূরের কথা—এক পা নড়ারও উপায় নেই।
সেদিন আমি ছিলাম রোজা।
কিন্তু সাথে ইফতারের জন্য কিছুই ছিল না।
জমজমের পানিও নেওয়ার সুযোগ নেই—হাজার হাজার মানুষের ঢল।
মনে প্রশ্ন জাগল,
“আমি আজ ইফতার করব কী দিয়ে?”
ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে—আল্লাহর কুদরতি ব্যবস্থা যেন নীরবে নেমে এলো। হঠাৎ দেখি, বোরকা পরিহিত এক লম্বা, ফর্সা, শান্ত মুখের মহিলা হাতে দু’গ্লাস জমজমের পানি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। ইংরেজিতে নরম কণ্ঠে বললেন,
“Do you need water?”
আমি বিস্মিত, বাকরুদ্ধ। হাত বাড়িয়ে একটি গ্লাস নিলাম। কিছুক্ষণ পর দু’জন আফ্রিকান যুবক এসে খেজুর ও কেক দিয়ে গেল।
আল্লাহু আকবার!
ইফতার সম্পন্ন হলো—ঠিক সময়ে, ঠিকভাবে।
মাগরিবের নামাজ আদায় করে হোটেলে ফিরে এলাম। কিন্তু হৃদয়ের ভেতর প্রশ্নের ঢেউ থামছিল না।
যেখানে আমি ছিলাম—সেখানে তো মূলত পুরুষদের অবস্থান।
এত ভিড়ের মাঝে সেই মহিলা কীভাবে এলেন?
তিনি জানলেন কীভাবে আমি রোজাদার?
আর অন্য গ্লাস পানিটিই বা কাকে দিলেন?
তারপর মনে হলো—
তিনি জানলেন কীভাবে?
*কারণ জানার মালিক তো একমাত্র আল্লাহ।*
তিনি অন্তর্যামী।
তিনি রিজিকের মালিক।
তিনি তাঁর বান্দাকে ভিড়ের মাঝেও ভুলে যান না।
সেই মুহূর্তে হৃদয় ভরে উঠল কৃতজ্ঞতায়, চোখ ভিজে উঠল আবেগে।
আমি বুঝলাম—
আল্লাহ যখন কাউকে দেন, তখন কারণ খোঁজার দরকার হয় না।
তিনি যাকে চান, যেভাবে চান, যেখানেই চান—রিজিক পৌঁছে দেন।
আলহামদুলিল্লাহ।
ভিড়ের মাঝেও যে রিজিক পৌঁছে যায়—সে শিক্ষা আমি কাবা ঘরের সামনে শিখে এসেছি।