
সাবিত রিজওয়ান
মা শহরে খালার বাসায় যাওয়ায় তুফান ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই। অনেক রাত চিন্তায় চিন্তায় ঠিকমতো ঘুমানো হয়নি কি আজ বাড়ি ফাঁকা থাকায় দুপুরে একটু ঘুমাতে পেরেছিল তুফান। রাত বাজে বারোটা, ঠিক আগের রাতগুলোর মতো আজও চোখে ঘুম নেই।
বাহিরে প্রসাব করতে তার মনে কিছু শব্দ নাড়া দিল,”আমার জন্য পরিবার তো অনেক করলো, আমি করতে পারলাম না। আমি ব্যর্থ। বড় ভাইটিও আমাদের সংসারে টাকা দেয় না, ভাই যা কামাই করে তা নিজের সংসার চালাতে হিমশিম। বাবারো ত বয়স হয়েছে, আর কদিনই বা ইনকাম করতে পারবে। আমি খেয়েই যদি সব শেষ করি, কদিন পরে তারা চলবে কিভাবে? এর চেয়ে ভালো আমি বেকার আপদটি যদি আর কোনোদিন না খাই। তারা একটু চলুক। আল্লাহ তুমি বাবা-মাকে সুস্থ রাখিও, ভালো রাখিও আর আমায় ক্ষমা করিও। কোনো একদিন তো আমায় মরতেই হবে।”
মা তো মায়, মা যেখানেই থাকুক না কেন সন্তানের জন্য নিজমন ছটফট করবে।
পরের দিন
পরের দিন সকাল দশটার সময় মা এসে দেখে তুফান বাড়িতে নেই, ঘরের দরজায় ছিটকিনি দেওয়া। কই গেল তুফান?
দুপুর তিনটে বাজতে চলল তুফান নেই। সে তো কোথাও গেলে ছিটকিনিতে তালা মেরে যেত আর চাবি রাখতো মায়ের দেখানো বাড়ির রান্নাঘরের কোণে বাঁশটিতে বেঁধে লুকিয়ে।
প্রতিদিন যত খোঁটা শুনতে হয়।
মা ভাবল,”কোনো কাজ খুঁজতে গেছে নাকি!”
গতবছর এসএসসি পাশ করেছে তুফান।
বেলা চারটে গড়িয়ে পাঁচটা বাজে, তুফানের খোঁজ নেই। বাবা কল করেছে মা’র মোবাইলে।
“ছোটো ব্যাটা কি কোনো কাজ করবে না, কি করে সে সারাদিন?” বাবা জিগ্যেস করল মাকে।
মা বলল,”সারাদিন ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না, কাজের কথা বললে কানে নেয় না। ও নাকি জেগে উঠার চেষ্টা করেছিল, কোনো কারণ বা কারো আচরণে নাকি আবার ঘুমন্ত”
“বসে বসে খাওয়াই-এ ছেলেকে এসবই করতে বলো?”
“সকাল থেকে বাড়িতে দেখছিনা।”
রাত নেমে আসছে কিন্তু তুফান বাড়ি আসছে না, একটু চিন্তার বিষয়। পাশের বাড়ির একটা ছেলেকে ডেকে এনে ছেলেটির দ্বারায় কল দেওয়ালো তুফানের বন্ধু পাল্লবকে।
পল্লবকে তুফানের ব্যাপারে জিগ্যেস করায় পল্লব বলল,”কাল সকালের দিকে তো শুনছিলাম সে নাকি কারো বাড়িতে ঘুরতে যাবে। ও তো মোবাইলে রিচার্জও করে না, তাই হয়তো জানাতে পারেনি।”
তারপরের দিন
তারপরের দিন একদল জেলে এসে তুফানদের গ্রামে বলল,”আমরা মোটরঘরের পাশ দিয়ে আসতে দেখলাম ঘরের বিছানায় একটি মৃত ছেলে। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো। মাঝে মাঝে তুফান যেত ওখানে। গ্রামের মানুষরা গিয়ে দেখতে পেল লাশটি কোনো অপরিচিত লোকের নয়, তুফানের লাশ। কেউ একজন এসে তুফানের মাকে খবর দেওয়া মাত্রই ছুটে গেল মা। সবাই ধরাধরি করে লাশকে বাড়ির আঙিনায় এনে একটা খাটে শুয়ে দিল।
কিছু মানুষ মা’র ওখানে, কিছু পুরুষ লাশকে পরিষ্কার করছে গোসল করিয়ে দিতে। লাশের টিশার্টের পকেটে একটা চিরকুট ছিল।
তারা দেখল চিরকুটে লেখা আছে,”আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি পারলাম না তোমাদের মনমতো হতে। আমারও কিছু চাওয়ার ছিল, যা ভাগ্য-পরিস্থিতি-পরিশ্রমের অভাবে অপূর্ণ। তবে স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়েছে, অপূর্ণতা বলতে রইবেই বা কি? তবে চিন্তা হয়, আমার মরার পরে আমার বাবা-মা’র খোঁজ করবে কে, যত্ন করবে কে তবে আমি অনুরোধ করে গেলাম কেউ যেন বাবা-মা’র পাশে থাকে। আমার মতো হতভাগা যেন আর কেউ না হয়। নতুন করে জানিয়ে দিলাম আমার কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই, তারা যেন না জানে আমার মৃত্যুর খবর।”