
মোঃ রায়হান পারভেজ নয়ন
স্টাফ রিপোর্টার নীলফামারী
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বুড়ি তিস্তা নদী পুনঃখনন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আনসার বাহিনীর একটি ক্যাম্পে সংঘটিত হামলার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপস্থিতিতেই সংঘবদ্ধভাবে হামলা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টানা দুই দিন দখলে থাকার পর বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্যের সহায়তায় জলঢাকা ও ডিমলা থানার পুলিশ বুড়ি তিস্তা নদীসংলগ্ন আনসার ক্যাম্পটি পুনরুদ্ধার করে। তবে পুনরুদ্ধারের পর ক্যাম্পটিতে পাওয়া যায় শুধুই ধ্বংসস্তূপ।
এ ঘটনায় জলঢাকা থানায় গত ২ জানুয়ারি পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা দুটিতে নামীয় ৪১ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ৬৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আনসার বাহিনীর লুট হওয়া ১০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি, রেশন, পোশাক ও অন্যান্য সরকারি মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেফতারও করা সম্ভব হয়নি বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল থেকে বুড়ি তিস্তা নদীসংলগ্ন আনসার ক্যাম্প ও নদী খনন প্রকল্প এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার দিকে আলীম, জাহেদুল ও এমদাদুল হক নামের তিন ব্যক্তি মাইকিং করে লোকজন জড়ো করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েক শতাধিক মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায়।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে দুর্বৃত্তরা আবারও ক্যাম্পে প্রবেশ করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের মারধর করে ক্যাম্প থেকে বের করে দেয়। এরপর পুরো ক্যাম্প দখলে নিয়ে টিনশেড ও পাকা স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। জানালা-দরজা, জেনারেটর, অফিস সরঞ্জামসহ সব ধরনের সরকারি মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে ক্যাম্পটি কার্যত সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
এই হামলায় আনসার বাহিনীর ব্যবহৃত ১০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছিনতাইয়ের পাশাপাশি নদী খনন প্রকল্পে ব্যবহৃত সাতটি এক্সকাভেটর ভাঙচুর করে অচল করে দেওয়া হয়। প্রাথমিক হিসাবে সরকারি ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার ভিডিও ধারণ ও তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে একাধিক সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে আনসার সদস্য, সাংবাদিক, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
আহত আনসার সদস্য মো. এনামুল হক বলেন,
“আমাদের থাকার কক্ষ, অফিস ও আসবাবপত্র ভেঙে ফেলা হয়েছে। রেশন, পোশাক, নগদ অর্থসহ ব্যক্তিগত মালামাল লুট করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ব্যবহৃত গুলি ছিনতাই করা মানে সরাসরি দেশের নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জ করা।”
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান বলেন,
“দুই দিনে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি জমি উদ্ধার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে আমরা বাধার মুখে পড়েছি। সেনা ও পুলিশের উপস্থিতিতেই এমন তাণ্ডব চালানো হলেও কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি।
জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. মাজহারুল ইসলাম ভূঁইয়া, পিভিএম জানান,
আনসার ক্যাম্প থেকে ১০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি, রেশন ও পোশাক লুট করা হয়েছে। এখনো এসব মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।”
নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম পিপিএম বলেন,
নাশকতার ঘটনায় জলঢাকা থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুত সময়ের মধ্যেই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
পুনরুদ্ধার হওয়া আনসার ক্যাম্পটি এখন রাষ্ট্রীয় অবহেলার নয়, বরং ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের নিদর্শন বহন করছে। ডিমলার এই ঘটনা আর কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
ঘটনাকে ঘিরে জনমনে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন
সেনা ও পুলিশের উপস্থিতিতে কীভাবে এমন সংঘবদ্ধ হামলা সম্ভব হলো
লুট হওয়া গুলি ও অস্ত্র কোথায় গেল
কারা এই হামলার নেপথ্যে এবং কাদের প্রশ্রয়ে তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে
ডিমলার এই ঘটনা এখন রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করবে।