বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, শিক্ষাবিদ ও চারুকলা আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী সমীরণ চৌধুরী আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মায়াজাল ছিন্ন করে চিরবিদায় নেন। তাঁর অকাল প্রয়াণে দেশের শিল্পাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।শিল্পী সমীরণ চৌধুরী ২০ নভেম্বর ১৯৬৩ সালে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী, দক্ষ শিল্পশিক্ষক এবং চারুকলা চর্চার এক নিবেদিত অনুশীলনকারী। তাঁর সৃজনশীলতা, চিন্তাভাবনা ও শিক্ষাদান কার্যক্রম বাংলাদেশের চারুকলা শিক্ষায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তিনি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রয়িং ও পেইন্টিং বিভাগে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টস (বিএফএ) এবং মাস্টার অব ফাইন আর্টস (এমএফএ) ডিগ্রি অর্জন করে শিল্পশিক্ষার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান। দীর্ঘ শিল্পজীবনে তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য একক ও দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর শিল্পকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের শিল্পসংগ্রহে।
শিল্পী সমীরণ চৌধুরী নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট (নারায়ণগঞ্জ ফাইন আর্ট ইনস্টিটিউট)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ হিসেবে দেশের অসংখ্য প্রতিভাবান শিল্পী গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নবীন শিল্পীদের জন্য একটি শক্তিশালী ও সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যেখানে নিয়মিত শিল্পচর্চা ও বার্ষিক প্রদর্শনীর আয়োজন হয়ে আসছে। আমি চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস, খুলনা আর্ট একাডেমির পরিচালক। যদিও আমি সরাসরি শ্রদ্ধেয় সমীরণ চৌধুরী স্যারের শিক্ষার্থী ছিলাম না, তবে তাঁর শিল্পকর্ম ও শিল্পদর্শন আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি ২০১০ সাল থেকে খুলনা আর্ট একাডেমির পরিচালনায় চারুকলা ভর্তি কোচিং পরিচালনা করে আসছি, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ২২৩জন শিক্ষার্থী ও দেশের বাইরে আমার শিক্ষার্থীরা সাফল্যের সঙ্গে পড়াশোনা করছে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটেও আমার বহু শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সজীব মণ্ডল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্যারের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করলে তা দেখে আমি গভীরভাবে ব্যথিত হই। কারণ আমার শিক্ষার্থীদের যে কোনো শোক বা আঘাতের ব্যথা কিছুটা হলেও আমাকে স্পর্শ করে। আমি মনে করি, একজন চিত্রশিল্পী ও শিল্পগুরুর চলে যাওয়া মানে শুধু একটি ব্যক্তির চিরবিদায় নয় এটি শিল্পীদের স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার পথে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে।
একজন শিল্প সাধক হিসেবে, কোনো গুণীজনের প্রয়াণ সংবাদ আমাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আঘাত করে। আজ শ্রদ্ধেয় সমীরণ চৌধুরী স্যারের চলে যাওয়ার খবরে আমি এবং খুলনা আর্ট একাডেমি পরিবার গভীরভাবে শোকাহত।
শিল্পীরা কখনো সত্যিকার অর্থে মৃত্যুবরণ করেন না। তাঁদের রেখে যাওয়া শিল্পকর্মই তাঁদের চিরন্তন করে রাখে। সমীরণ চৌধুরী স্যারের সৃষ্ট শিল্পকর্ম ও শিক্ষাদর্শন তাঁকে শিল্পাঙ্গনে অমর করে রাখবে। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের এক অনন্য প্রয়াসক ও উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিল্পীরা আগামীতেও তাঁর চেতনা ও শিক্ষা বহন করে নতুন নতুন শীর্ষশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এটাই আমাদের বিশ্বাস।
আমরা স্যারের রেখে যাওয়া শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি এবং তাঁদের এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি কামনা করছি। প্রেস বিজ্ঞপ্তি