নিজস্ব প্রতিবেদক:
শত বছর আগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর লেখনীতে বাংলাদেশ নাম প্রথম উ”চারিত হয়। নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম, চির মনোরম চির মধুর... কিংবা “দূর আরবের স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে” কবি নজরুল বলেছিলেন, “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান” ”জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ “আমরা যদি না জাগি না, কেমনে সকাল হবে” “ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখী ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর” বিশ্বটাকে দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে, আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতীয় কবি কাজী নজরূল। তরুণ-প্রবীন সকলের সমবেত উ”চারণ হোক নজরুল এর চেতনা-দর্শনের, সাম্য-সম্প্রীতির ইনসাফের বাংলাদেশ বিনির্মান করা।
আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদীর সমাধি প্রাঙ্গনে বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের ১০৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর নিয়াজ আহমেদ খান এ কথা বলেন।
সোমবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি ও বিদ্রোহী নজরুল-বিপ্লবী ওসমান হাদী স্মরণ কমিটির যৌথ উদ্যোগে কবি আব্দুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা ও সমবেত কন্ঠে বিদ্রোহী কবিতা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও শপথ পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত স্মরণ অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করেন বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটির আহবায়ক বিশিষ্ঠ গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব ও রাস্ট্রচিন্তক মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান, প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ঠ নজরুল গবেষক, বহুভাষাবিদ কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী, বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ড. শাহরিয়ার ইফতেখার ফুয়াদ, নজরুল গবেষক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, মিসেস রেহেনা সালাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ, পরিবেশবিদ ও সবুজ আন্দোলনের চেয়ারম্যান বাপ্পি সরদার, কবি ফারহানা ইসলাম রিমা, এ্যাড. লুৎফুল আহসান বাবু, নাট্যকার এন. এইচ. বাদল, সংগঠনের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ শাহীন, যুগ্ম আহবায়ক খন্দকার মাওলানা শহীদুল হক, মোস্তফা কামাল মাহাদী, ফজলুর রহমান পলাশ প্রমুখ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান বলেন, নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, সাম্যবাদ, মানবতা, দ্রোহ ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন এবং বিপ্লবী শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর আত্মত্যাগ ও সংগ্রামী জীবন আমাদের চলার পথের পাথেয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও বিপ্লবী শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর আদর্শ অনুসরণ করে সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।
প্রধান আলোচক কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের চেতনা ছিল মূলত সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর এই চেতনার পরিপন্থী যে কোনো সংস্কৃতি বা অপশক্তির বিলোপ ঘটানো একটি ইনসাফের সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। তিনি ছিলেন চিরবিদ্রোহী। দরিদ্র ও মেহনতী মানুষের ওপর অত্যাচার করে যে পুঁজিবাদী ও শোষক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, তাদের সংস্কৃতিকে প্রতিরোধ করার আহ্বান নজরুলের সাহিত্য আমাদের দেয়।
তিনি আরো বলেন আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন বা অপসংস্কৃতির ভিড়ে নজরুলের দেশপ্রেম ও দ্রোহের গানকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
নজরুলের চেতনা বিরোধী সংস্কৃতির মূলোৎপাটন মানেই হলো একটি মানবিক, সাম্যবাদী, ইনসাফের এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সক্রিয় হওয়া।
বিশেষ অতিথি ড. শাহরিয়ার ইফতেখার ফুয়াদ বলেন, আমরাই বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের ভিত রচনা করেছিলাম। সেই বিদ্রোহী থেকেই আজ জুলাই বিপ্লব। আধিপত্যবাদের দোসররা আর এদেশে থাকতে পারবে না। ছাত্র জনতার আন্দোলন এর সুফল “গণতন্ত্র ও সুশাসন শাসন নিশ্চিত করতে হবে।” দেশ হতে দুর্নীতি ও সকল বৈষম্যের মূল উৎপাটনের মাধ্যমে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার শপথ নিতে হবে।
বিশেষ অতিথি নজরুল গবেষক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সত্যিকার অর্থেই জুলাই বিপ্লবী চেতনার বাতিঘর। জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি উচ্চারণে কবি নজরুলের লেখা অনিবার্য বিপ্লবের প্রতীক হয়ে স্লোগান দেয়াল লিখনসহ প্রতিটি কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের এই অবিসংবাদিত কবি কালজয়ী প্রেরণা হয়ে বারবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা জাতীয় কবিকে যথাযথ মর্যাদা দিতে পারিনি।
তিনি আরো বলেন নজরুলের চেতনা শোষণের বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের জন্য নজরুল সবসময়ই প্রাসঙ্গিক। মানবাধিকার ফিরিয়ে আনতে, আইনের শাসন, নারীর স্বাধীনতা বা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার নতুন সংগ্রামের পথে নজরুল আমাদের অনিবার্য প্রেরণা। জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি উচ্চারণে, পোস্টার স্লোগানে নজরুলের সেই বৈপ্লবিক চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদী হলেন নজরুল চেতনা ও দ্রোহের শ্রেষ্ঠ প্রতিকৃত তারুণ্য। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে, সেখানে ‘হাদী’ ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার চেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সভাপতির বক্তব্যে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ও শহীদ ওসমান হাদীর আদর্শ আজও শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমাদের পথ দেখায়। তাঁদের বিদ্রোহী চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এমন আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের দর্শন ও চেতনার বৈষম্যহীন ইনসাফের বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা নিরলস কাজ করে যাবো।