
মোঃ রায়হান পারভেজ নয়ন
স্টাফ রিপোর্টার, নীলফামারী
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নীলফামারীর ডিমলা–জলঢাকা মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বুড়ি তিস্তা নদীর ওপর অবস্থিত কালীগঞ্জ সেতুর নিরাপত্তায় নিয়োজিত একটি আনসার ক্যাম্পে সংঘটিত এই ঘটনায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও এখনো উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া অস্ত্র ও সরকারি মালামাল। গ্রেপ্তারও করা হয়নি কাউকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ২০২১ সালের মে মাসে অনুমোদিত বুড়িতিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বুড়িতিস্তা সেচ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ে ৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খননের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্প এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে এসএ ও বিএস রেকর্ডভুক্ত মোট ১ হাজার ২১৭ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতে খননসহ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদন দেওয়া হয়।
ভূমিদস্যুদের তাণ্ডব
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুড়িতিস্তা ব্যারেজ সংলগ্ন ও উজানের কুঠিরডাঙ্গা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৭ শতাধিক ভূমিদস্যু পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ডীয় জমি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। খনন কাজ শুরু করতে গেলেই দখলদারদের সঙ্গে পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
দুই দফা হামলা ও লুটপাট
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভূমিদস্যু নেতা হিসেবে পরিচিত আব্দুল আলীমের নেতৃত্বে মাইকিং করে শত শত লোক জড়ো করা হয়। তারা পরিকল্পিতভাবে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটতরাজ করে। এ সময় আনসার সদস্যদের ব্যবহৃত ১০ রাউন্ড গুলি, প্রায় ৫০ জন সদস্যের ব্যক্তিগত মালামাল, আসবাবপত্র, রেশন ও নগদ অর্থ লুট করা হয়। পাশাপাশি খনন কাজে ব্যবহৃত ৭টি এক্সকাভেটর ভাঙচুর করে অকেজো করে দেওয়া হয়।
পরদিন ১ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় আবারও হামলা চালানো হয়। অস্ত্রের মুখে আনসার সদস্যদের ক্যাম্প ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং অবশিষ্ট সব মালামাল লুট করে ক্যাম্পের স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা হয়।
পরবর্তীতে বিকেল ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় জলঢাকা ও ডিমলা থানার পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করে আনসার ক্যাম্প। তবে তখন ক্যাম্পে কার্যত কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। একটি পাকা ভবন উদ্ধার করা হলেও সেটির দরজা-জানালাও খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
মামলা হলেও নেই গ্রেপ্তার
এই ঘটনায় আনুমানিক আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জলঢাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জুলফিকার রহমান বাদী হয়ে ৩ জানুয়ারি জলঢাকা থানায় ৪১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা প্রায় ৭ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেন। তবে এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং লুট হওয়া অস্ত্র ও মালামাল উদ্ধার হয়নি।
প্রশাসনের বক্তব্য
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান বলেন,
“বুড়িতিস্তা জলাধার খনন প্রকল্প বন্ধ করতে একটি অসাধু গোষ্ঠী মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে উসকানি দিচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধুমাত্র অধিগ্রহণকৃত ১ হাজার ২১৭ একরের মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতেই কাজ করবে। ব্যক্তিগত তিন ফসলি জমি দখলের অপপ্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিনি আরও বলেন,
কেপিআইভুক্ত বুড়িতিস্তা ব্যারেজ ও আনসার ক্যাম্পে প্রকাশ্যে হামলা ও লুটপাট সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি। আগের ঘটনাগুলোতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়েছে। দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
নতুন করে প্রশ্ন
ঘটনার পর দুই দিনের সহিংসতায় জড়িত অপরাধীরা প্রকাশ্যেই মশাল মিছিল ও মানববন্ধন করে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। এতে কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তা, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং সংগঠিত ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে সারাদেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।