শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৩২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
খুলনা আর্ট একাডেমির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি অর্জনে গর্বিত প্রতিষ্ঠান মানবিকতার আলোকবর্তিকা স্পেশাল ব্রাঞ্চের মানবিক সাব-ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে ক্লাসিক চেস্ ক্লাবের সম্মাননা কবিতাঃ জীবন কবিতা নিয়ামতপুরে সরস্বতী পূজা উদযাপিত জগন্নাথপুরে গণভোটের পক্ষে উৎসাহিত করলেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক গ্রেটার ইসরায়েল শখ মুছে গেলো! জগন্নাথপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের গণসংযোগ, ভোটারদের ব্যাপক সাড়া বিদ্যুৎ ফাউন্ডেশন: মানবতার আলোর পথে ধানের শীষে ভোট দেয়ার আহবান শোডাউনের মধ্যদিয়ে প্রচারণা শুরু করলেন তুহিন মোরেলগঞ্জে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত ভিপিকে গণসংবর্ধনা, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন- অধ্যক্ষ আব্দুল আলীম

ছোটগল্পঃ অদ্বৈত ত্যাগ

Coder Boss
  • Update Time : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ Time View

কলমেঃ ইরি অতনু

​অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে তখন শোকের ছায়া। রামচন্দ্র বনবাসে যাচ্ছেন, সঙ্গে জানকী। কিন্তু লক্ষ্মণ? তিনি তো রামের ছায়া। রামকে ছেড়ে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু নববিবাহিত পত্নী উর্মিলার কী হবে?
​লক্ষ্মণ যখন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে উর্মিলার কক্ষে প্রবেশ করলেন, দেখলেন উর্মিলা প্রস্তুত। তিনি বাধা দিলেন না, বরং অশ্রুভেজা চোখে স্বামীকে বিদায় জানানোর শক্তি সঞ্চয় করলেন। লক্ষ্মণ বললেন, “উর্মিলা, আমি দাদা ও দিদির সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছি। সেখানে নিদ্রা বা ক্ষুধার স্থান নেই। আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি, তবে তাঁদের সুরক্ষা কে দেবে?”
​উর্মিলা স্মিত হেসে স্বামীর হাত ধরলেন। তিনি জানতেন, তাঁর স্বামী সাধারণ পুরুষ নন। তিনি বললেন, “আর্যপুত্র, আপনি আপনার কর্তব্য পালন করুন। আপনার নিদ্রা আমি গ্রহণ করব, আর আমার এই শরীরের ক্ষুধা আপনি গ্রহণ করুন। আমাদের আত্মা এক হয়ে থাকুক এই ত্যাগের মধ্য দিয়ে।”

​অযোধ্যার রাজপ্রাসাদের এক কোণে এক নিভৃত কক্ষে চৌদ্দ বছর ধরে এক দীর্ঘ রজনী নেমে এল। নিদ্রাদেবী যখন লক্ষ্মণের চোখে ভর করতে চাইলেন, লক্ষ্মণ তাঁকে অনুরোধ করলেন, “দেবী, আমাকে জাগিয়ে রাখো। আমার পরিবর্তে এই নিদ্রা তুমি মিথিলা-নন্দিনী উর্মিলার চোখে স্থাপন করো।”
​শুরু হলো উর্মিলার সেই ঐতিহাসিক মহানিদ্রা। বাইরে ঋতু বদলায়, উৎসব আসে, কিন্তু উর্মিলার কক্ষটি যেন সময়ের ঊর্ধ্বে এক শান্ত সমুদ্র। তিনি ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু এই ঘুম সাধারণ আলস্য নয়। এটি ছিল এক প্রচণ্ড আধ্যাত্মিক সাধনা। লক্ষ্মণ বনের হিংস্র পশু আর অন্ধকার থেকে রাম-সীতাকে রক্ষা করতে গিয়ে যে ক্লান্তি অনুভব করতেন, সেই ক্লান্তির বোঝা নিজের মাথায় তুলে নিলেন উর্মিলা।
​উর্মিলার শরীরের প্রতিটি কোষ যেন লক্ষ্মণের বিশ্রামের আধার হয়ে উঠল। তিনি ঘুমালেন যাতে লক্ষ্মণ জাগতে পারেন। তাঁর এই ঘুম ছিল প্রেমের চরম পরীক্ষা। লোকে তাঁকে ‘অভাগী’ ভাবলেও, তিনি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেমিকা, যিনি স্বামীর বীরত্বকে নিজের নিঃশব্দ ঘুমের মধ্য দিয়ে পুষ্ট করেছিলেন।

​অন্যদিকে, চিত্রকূট থেকে দণ্ডকারণ্য—লক্ষ্মণ এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করেননি। তাঁর পেটে ক্ষুধার অন্ন নেই, চোখে নেই ঘুমের লেশ। বনবাসের চৌদ্দ বছর লক্ষ্মণ কিছুই আহার করেননি। এই অলৌকিক ক্ষমতার উৎস ছিল উর্মিলার ত্যাগ।
​উর্মিলা প্রাসাদে থেকেও উপবাসী ছিলেন মনে-প্রাণে, আর তাঁর সেই ক্ষুধার দহন লক্ষ্মণ নিজের শরীরে অনুভব করতেন। লক্ষ্মণ যখন বনের ফলমূল সংগ্রহ করে রাম ও সীতাকে পরিবেশন করতেন, তখন তাঁর নিজের উদর পূর্ণ হতো উর্মিলার ভালোবাসার শক্তিতে। উর্মিলার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি যেন সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্মণের দেহ থেকে সঞ্চারিত হতো।
​মেঘনাদ বধের সময় যখন শর্ত এল যে, ‘এমন এক ব্যক্তিই তাকে মারতে পারবে যে চৌদ্দ বছর ঘুমায়নি এবং আহার করেনি’, তখন সারা বিশ্ব দেখল উর্মিলার ত্যাগের মহিমা। লক্ষ্মণ যে অপরাজেয় হয়ে উঠেছিলেন, তার নেপথ্যে ছিল উর্মিলার সেই শান্ত, গভীর ঘুম।

​চৌদ্দ বছর পর। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার লগ্ন সমাগত। অযোধ্যা দীপাবলিতে সেজে উঠেছে। কিন্তু লক্ষ্মণের চোখ খুঁজছে সেই কক্ষটি, যেখানে চৌদ্দ বছর আগে তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় পত্নীকে রেখে গিয়েছিলেন।
​কক্ষের দ্বার খুলতেই লক্ষ্মণ দেখলেন, উর্মিলা ধীরে ধীরে চোখ মেলছেন। দীর্ঘ নিদ্রার অবসান হয়েছে। তাঁর চোখে কোনো অভিযোগ নেই, আছে কেবল এক গভীর প্রশান্তি। লক্ষ্মণের শরীর আজ ক্লান্ত, তাঁর চোখে এখন সেই চৌদ্দ বছরের জমে থাকা ঘুম।
​উর্মিলা উঠে দাঁড়ালেন। স্বামীর শীর্ণ কিন্তু তেজস্বী মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরল। লক্ষ্মণ উর্মিলার চরণে প্রণাম করতে গেলে উর্মিলা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।
​লক্ষ্মণ ফিসফিস করে বললেন, “উর্মিলা, আজ আমি ক্ষুধার্ত। আজ তোমার হাতের অন্ন না খেলে আমার এই চৌদ্দ বছরের উপবাস সার্থক হবে না।”
উর্মিলা হেসে উত্তর দিলেন, “আর আর্যপুত্র, আপনি আজ ঘুমান। আপনার সব ক্লান্তি আমি ধুয়ে দিচ্ছি। আজ থেকে আমি জাগব, আর আপনি আমার কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেবেন।”

​রামায়ণের ইতিহাসে রাম-সীতার প্রেম যদি হয় আদর্শের প্রতীক, তবে লক্ষ্মণ-উর্মিলার প্রেম হলো পরিপূরক সত্তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যেখানে একজন জাগলে অন্যজন ঘুমায়, একজনের ক্ষুধা অন্যজন মেটায়। তাঁদের এই ত্যাগ শিখিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের প্রেমে বিচ্ছেদ মানে দূরত্ব নয়, বরং একে অপরের ভেতর মিশে যাওয়ার এক গভীর সাধনা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102