
এস.এম.সাইফুল ইসলাম কবির:
গণতন্ত্র মানবজাতির রাজনৈতিক বিবর্তনের এক ঐতিহাসিক অর্জন। হাজার বছরের শাসন–শোষণ, রাজতন্ত্র, সামন্তবাদ ও স্বৈরাচার পেরিয়ে মানুষ এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার কল্পনা করেছে, যেখানে ক্ষমতার প্রকৃত উৎস হবে জনগণ এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের সম্মতিতে। কিন্তু গণতন্ত্র কেবল ভোটাধিকার বা নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের প্রাণ নিহিত রয়েছে স্বাধীন চিন্তা, মতপ্রকাশ, তথ্যপ্রবাহ এবং জবাবদিহিমূলক শাসনে। এই মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর ও দৃশ্যমান মাধ্যম হলো গণমাধ্যম।
গণমাধ্যম রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার সেতুবন্ধন। এটি জনগণকে জানায় রাষ্ট্র কী করছে এবং রাষ্ট্রকে জানায় জনগণ কী চায়। কিন্তু এই সেতু যদি নিয়ন্ত্রিত, দুর্বল বা ভঙ্গুর হয়, তবে গণতন্ত্র কেবল একটি নামমাত্র কাঠামোয় পরিণত হয়। তাই দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র কল্পনাই করা যায় না।
গণতন্ত্রের ধারণা ও তার মৌলিক ভিত্তি
গণতন্ত্র শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক ভাষা থেকে—ডেমোস (জনগণ) এবং ক্রাটোস (শাসন)। অর্থাৎ জনগণের শাসন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণ সরাসরি শাসন করে না; তারা প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করে। এই প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে প্রয়োজন তথ্য, স্বচ্ছতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভগুলো হলো—
১. জনগণের সার্বভৌমত্ব
২. আইনের শাসন
৩. মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
৪. ক্ষমতার বিভাজন
৫. জবাবদিহিতা
এই প্রতিটি স্তম্ভ কার্যকর রাখতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। কারণ গণমাধ্যম ছাড়া জনগণ জানতেই পারবে না তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, শাসকরা দায়িত্ব পালন করছে কি না।
গণমাধ্যম: সংজ্ঞা ও বিস্তৃতি
গণমাধ্যম বলতে বোঝায় এমন সব মাধ্যম, যার মাধ্যমে তথ্য, সংবাদ, মতামত ও চিন্তা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবই আধুনিক গণমাধ্যমের অংশ।
গণমাধ্যমের কাজ কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়; এটি সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। সমাজের সমস্যা, বৈষম্য, অন্যায় ও সম্ভাবনাগুলো গণমাধ্যমের মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ ও তাৎপর্য
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে বোঝায়—সংবাদ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশে কোনো ধরনের অযৌক্তিক রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক চাপ বা অর্থনৈতিক প্রভাব না থাকা। এই স্বাধীনতা সাংবাদিকদের সত্য অনুসন্ধানের সাহস দেয়।
একটি স্বাধীন গণমাধ্যম—
ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করতে পারে
সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরতে পারে
বিরোধী মতামত প্রকাশ করতে পারে
সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বলতে পারে
এই কাজগুলো গণতন্ত্রের জন্য অত্যাবশ্যক।
গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক
গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক। গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র অন্ধ, আর গণতন্ত্র ছাড়া গণমাধ্যম অর্থহীন।
তথ্যভিত্তিক নাগরিক সমাজ
গণতন্ত্রের সফলতার জন্য প্রয়োজন সচেতন নাগরিক। সচেতনতা আসে তথ্য থেকে, আর তথ্য আসে গণমাধ্যমের মাধ্যমে। জনগণ যদি সঠিক তথ্য না পায়, তবে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা
গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নজরদারি করে। দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার গণমাধ্যম উন্মোচন করে বলেই শাসকগোষ্ঠী কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত থাকে।
মতপ্রকাশ ও বিতর্ক
গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। গণমাধ্যম এই ভিন্নমতের প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে। আলোচনা, বিতর্ক ও সমালোচনার মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
গণমাধ্যম স্বাধীন না হলে গণতন্ত্রের বিপর্যয়
যে রাষ্ট্রে গণমাধ্যম স্বাধীন নয়, সেখানে গণতন্ত্র টিকতে পারে না।
সত্যের দমন
নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম সত্যকে আড়াল করে, মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে। জনগণ বাস্তব পরিস্থিতি জানতে পারে না।
স্বৈরতন্ত্রের উত্থান
ইতিহাস প্রমাণ করে—স্বৈরশাসনের প্রথম পদক্ষেপই হলো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ। কারণ সত্যই স্বৈরশাসকের সবচেয়ে বড় শত্রু।
ভয়ের সংস্কৃতি
সাংবাদিকরা যখন ভয় পায়, তখন সমাজে আত্মসেন্সরশিপ শুরু হয়। মানুষ কথা বলা বন্ধ করে দেয়। গণতন্ত্র তখন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়।
বিশ্ব ইতিহাসে গণমাধ্যমের ভূমিকা
বিশ্ব ইতিহাসে গণমাধ্যম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম চালিকাশক্তি।
ইউরোপের রেনেসাঁ ও আলোকপ্রাপ্তির যুগে পুস্তিকা ও সংবাদপত্র মানুষের মুক্তচিন্তার পথ খুলে দেয়।
আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনে সংবাদপত্র ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে।
ফরাসি বিপ্লবে গণমাধ্যম জনগণকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে।
অন্যদিকে, নাৎসি জার্মানি, স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বিভিন্ন সামরিক শাসনে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গণমাধ্যমের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল।
ভাষা আন্দোলন
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সংবাদপত্র, পত্রিকা ও লিফলেট বাংলা ভাষার দাবিকে জনসমর্থনে রূপ দেয়।
মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, সাহস ও তথ্যের প্রধান উৎস ছিল।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন
আশির ও নব্বইয়ের দশকে গণমাধ্যম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই ইতিহাস প্রমাণ করে—গণমাধ্যম দুর্বল হলে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়।
ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যমের নতুন রূপ
ডিজিটাল প্রযুক্তি গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ইতিবাচক দিক
দ্রুত তথ্য প্রবাহ
সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
বিকল্প মত প্রকাশের সুযোগ
নেতিবাচক দিক
ভুয়া খবর
গুজব
অপপ্রচার
তাই আজ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি মিডিয়া সাক্ষরতা ও নৈতিকতা অপরিহার্য।
স্বাধীনতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানেই দায়িত্বহীনতা নয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমকে সত্যনিষ্ঠ, মানবিক ও নৈতিক হতে হবে। দায়িত্বশীল স্বাধীনতাই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের দায়িত্ব
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় তিন পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে—
রাষ্ট্রের দায়িত্ব—
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেওয়া
সমাজের দায়িত্ব—
স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সমর্থন করা
গণমাধ্যমের ওপর অযৌক্তিক চাপ না দেওয়া
নাগরিকের দায়িত্ব—
সত্য সংবাদ গ্রহণ করা
ভুয়া খবর প্রত্যাখ্যান করা
উপসংহার
গণতন্ত্র কোনো স্থির কাঠামো নয়; এটি একটি চলমান সংগ্রাম। এই সংগ্রামকে সচল রাখতে প্রয়োজন স্বাধীন গণমাধ্যম। গণমাধ্যম ছাড়া জনগণ অন্ধ, রাষ্ট্র বেপরোয়া এবং গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে।
অতএব নির্দ্বিধায় বলা যায়—
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি শব্দমাত্র, বাস্তবতা নয়।
এস.এম.সাইফুল ইসলাম কবির
চেয়ারম্যান জাতীয় মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ঢাকা।