যুবসমাজ একটি দেশের
প্রাণশক্তি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। সকল ধর্মগ্রন্থেই যুবসমাজকে নৈতিকতা ও সুশিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে” (সূরা রা’দ: ১১)। বাইবেলে বলা হয়েছে, “শিশুকে সে যে পথে চলবে, সেই পথে শিক্ষা দাও; সে বৃদ্ধ হলেও তা থেকে সরে যাবে না” (প্রবাদ ২২:৬)। গীতা নির্দেশ দেয়, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রকৃত জ্ঞানীর লক্ষণ। এসব বাণী স্পষ্ট করে দেয় যে, নৈতিক ও চরিত্রবান যুবসমাজ গঠনের মাধ্যমেই একটি জাতির কল্যাণ নিশ্চিত হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই যুবসমাজই নৈতিক অবক্ষয়ের এক গভীর সংকটে পতিত হচ্ছে, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।
নৈতিক অবক্ষয় বলতে বোঝায় মানুষের চরিত্র থেকে সততা, শালীনতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের ক্রমাগত বিলুপ্তি। যুবসমাজের ক্ষেত্রে এই অবক্ষয় সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এই বয়সেই ভবিষ্যৎ জীবনের দিশা নির্ধারিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “শিক্ষা সেই যা আমাদের চরিত্র গঠন করে।” অথচ আজকের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরিত্র গঠনের চেয়ে সনদ ও ফলাফলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে জ্ঞান অর্জিত হলেও নৈতিকতা ও মানবিকতা অনেকাংশে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের পেছনে অন্যতম কারণ পারিবারিক অবহেলা ও ভাঙন। পরিবার হলো মানুষের প্রথম বিদ্যালয়। সেখানে যদি ভালোবাসা, শাসন ও নৈতিক শিক্ষা অনুপস্থিত থাকে, তবে সন্তানের চরিত্র বিকাশ ব্যাহত হয়। আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বেকারত্বও যুবসমাজকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে। কর্মসংস্থানের অভাবে তারা সহজ পথে অর্থ উপার্জনের লোভে অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আরিস্টটল যথার্থই বলেছেন, “নৈতিকতা অভ্যাসের ফল”—কিন্তু সেই অভ্যাস গড়ে তোলার উপযুক্ত পরিবেশ আজ অনেক যুবকের নেই।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আদর্শহীন রাজনীতি যুবসমাজকে আরও বিভ্রান্ত করছে। ক্ষমতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে যুবকদের ব্যবহার করা হচ্ছে হাতিয়ার হিসেবে। পাশাপাশি অপসংস্কৃতির আগ্রাসন নৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে। অশ্লীল বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার ও বিদেশি বিকৃত সংস্কৃতি যুবসমাজের চিন্তা ও মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সক্রেটিস বলেছিলেন, “নৈতিক শিক্ষা ছাড়া জ্ঞান মানুষকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।” এই কথার সত্যতা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সুশিক্ষা। সুশিক্ষা মানে কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান নয়, বরং নৈতিকতা, আত্মসংযম, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বিত বিকাশ। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে হতে হবে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল। যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য, যাতে তারা আত্মমর্যাদাশীল জীবন গড়ে তুলতে পারে।
সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদনের চর্চাও যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে পারে। সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও খেলাধুলা যুবকদের মানসিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখে। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” এই মানবিক দর্শন যুবসমাজের মনে জাগ্রত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
পরিশেষে বলা যায়, যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় কোনো একক সমস্যার ফল নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। সুশিক্ষা, সুপরিবার, সুসংস্কৃতি ও নৈতিক আদর্শের সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। নৈতিক ও আদর্শবান যুবসমাজই পারে একটি শক্তিশালী, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক জাতি গড়ে তুলতে।