কলমেঃ কাকলি রানী ঘোষ
উঠানের ধান শুকাতে দিয়েতো জ্যাঠামশাইরা।
ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসতো ধান খেতে। এক ঝাঁক চড়ুই, এক ঝাক শালিক, এক ঝাঁক পেঁচা, পাখি। এই পাখিগুলো বাড়ির ভিতর আসার সাহস পাই। এরা মানুষের বেশ কাছাকাছি থাকে। ধান খেতে খেতে এরা বাধায় ঝগড়া। ভিতরে বেশ গর্ব অহংকারও আছে। একে অপরে দ্রুত ধান খেতে থাকে। আর কি যেন তাদের ভাষায় বলতে থাকে। ধান খেয়ে আবার উড়ে যেত ঝাঁক ধরে। একজন বসে থাকতো বারান্দায়। তাদের তাড়ানোর জন্য। এভাবে চলতো বেলা দুটো আড়াইটে। বেশ লাগতো আমার। ওদের দেখতাম ভাবভঙ্গি। কি কি করতে চাই বলতে চাই। কি তাদের ভাষা। খেয়াল করলে দেখা যায় অনেক চাটুকারিতা আছে ওদের ভিতর। যা উপভোগ্য ছিল।
বাড়ির ভিতরে আসে ঘুঘু পাখি। এরাও উড়ে উড়ে ধানগুলো খেয়ে যায়।
তবে আভিজাত্য পরায়ণ পাখিগুলো আসে না তেমন বাড়ির ভিতরে। এ ধরনের টিয়া পাখি, কাঠঠোকরা, ময়না, বুলবুল পাখি, শ্যামা, টুনটুনি, আরো অনেক নাম না জানা সুন্দর সুন্দর পাখি।
এমন অনেক অজানা পাখি আমাদের আশেপাশের বাগানে ডালে ডালে ঘুরে বেড়ায়। একবার বাগানে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি একটা পাখি এত সুন্দর, লেজ অত্যাধিক লম্বা, লেজে সুন্দরী সাজানো পাকনা, মনে হয় যেন পাখনা গুলো কেউ সাজিয়ে দিয়েছে তার গায়ের উপরে। কিন্তু আমি তার নাম জানিনা। আজও মনের ভিতর গেঁথে আছে তার চেহারা। এমন অনেক পাখি ঘুরে ঘুরে বেড়াই আমাদের ধারের কাছে, বাগানে পোকা খায় আনন্দে লাফালাফি করে ডাকে আপন সুরে তার প্রিয়জনকে। ভোরে যখন উঠি, বিশেষ করে গরমের সময়। এখনতো শীতকাল এখন শোনা যায় না। পাখিগুলো এত সুন্দর ভাবে ডাকে, অসাধারণ।
প্রত্যেকটা পাখির আলাদা আলাদা সুর। তার প্রিয়জনদেরকে ডাকছে। খাদ্যের খোঁজে উড়বে তারা আকাশে আকাশে। ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলেছে যেন প্রকৃতিকে।
পায়রাদের ঝাঁক উড়ে বেড়ায় আকাশে। বেশ লাগে যখন তারা নীল আকাশের গায়ে উড়ে উড়ে খুশি মনে আনন্দ করে। ডিগবাজি খায়। ঝাকে ঝাকে পায়রা যেখানে ধানকাটা হয়েছে সেখানে পায়রার দলেরা ধান খুঁটে খুঁটে খায় খুব ব্যস্ততার সঙ্গে। ফাঁকা মাঠ ধান কাটার পরে ফাঁকা মাঠের অন্য রূপ ধারণ করে। যেন কেউ হলুদ রং ঢেলে দিয়েছে মাঠে মাঠে।
ধানের গোড়াগুলো থাকে উঁচু হয়ে। ঠিক যেন দূর থেকে মনে হয় কোন শিল্পী রংয়ের ছোঁয়া দিয়েছে তার তুলি দিয়ে। আঁকাবাঁকা নালা। এই নালা দিয়ে জল আনে কৃষকেরা ধান ক্ষেতে দেওয়ার জন্য। নালা গুলো ওই হলুদের ভিতরে সবুজ হয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে মাঠের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দুটো তালগাছ আছে দাঁড়িয়ে। বেশ উঁচু হয়ে আকাশ ছুঁয়ে।
দিগন্ত জোড়া নীল আকাশ। দিগন্ত ঘেঁষে সবুজের আঁকিবুকি। দূর থেকে মনে হয় সবুজের পাহাড়। কোথাও উঁচু গাছ কোথাও নিচু গাছ। গাছে গাছে খুঁজলে পাওয়া যায় পাখির বাসা। পাখির বাসায় থাকে ছোট ছোট বাচ্চা। একটু শব্দ পেলেই কিচ কিচ করে ওঠে।
দেখেছি বাগানে হলুদ ফুলে শিশিরের জল লুকিয়ে থাকে। সুন্দর সুন্দর কচু গাছের ফুল। তেলা কচু গাছে যখন তেলা কচুর ফল লাল হয়ে থাকে। তখন পাখিরা তা মজা করে খায়। তেলা কচুর ফল দিয়ে রান্না হতো ছোটবেলায় হাঁড়ি কুড়ি। মাটির হাঁড়িকুড়ি, বেশ রান্না হতো, ধুতরা ফুলের কাঁঠাল, তেলা কচুর ফল, মেটে হাড়ির টুকরোগুলো মাছ, মাংস বানানো হত ইটের খোয়া বা পাথর। বেশ তোড়জোড় রান্না চলতো। দোকান বসাতো কলার পাতা দিয়ে। মাটি দিয়ে বানানো নানা খাওয়ার আয়োজন। চলতো একে অপরের দিওয়াথোয়া । মাটি দিয়ে তৈরি হতো নানান পিঠা। কুলি পিঠা ছিল তার ভিতরে সুন্দর কারু কাজ। স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে তাই। সেখানে যেন ছিল অপর আনন্দ। ঘুড়ি ওড়ানো, গোল্লাছুট, বউ চুরি, লুকোচুরি, আরো কত কি খেলা। কিৎকিৎ, এই খেলাটা বেশ প্রিয় ছিল। ডাংগুলি খেলা। যখন কিশোর কিশোরী বয়সে পা দেয়, তখন আস্তে আস্তে এই খেলা গুলোকে ছেড়ে জীবনের কথা ভাবতে হয়। পড়াশুনো দায়িত্ব আরো কত কি। ওগুলো হয়ে ওঠে অতীত। আস্তে আস্তে দূরে চলে যায় ওরা। গল্প হয় অন্য, কবিতা আসে মনে। মনে ছোয়া লাগে প্রকৃতির প্রেম। ভাবতে ইচ্ছে হয় প্রকৃতিকে, কবিতা লিখতে ইচ্ছা হয়। ইচ্ছা হয় ছোটবেলার খেলা গুলো বাস্তব জীবনে ঘটাতে। সংসার শুরু হয় রান্নাবান্না। এখন শুধুই ঝরা পাতা। শীতের আবেশ। ঝরে যাব কখন পথের ধুলোয়। মিশে যাবো মাটিতে। জীবনের পরিবর্তন হয়। বারবার ফিরে আসে একই ঋতু। ছয়টি ঋতু। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত বসন্তে। বসন্ত জীবনে হয়তো আমাদের আর আসে না। শীত ঋতু মতোই ঝরা পাতা হয়ে ঝরতে হয় মাটির কোলে।