মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৩ অপরাহ্ন

পড়িলে বই, আলোকিত হই

Coder Boss
  • Update Time : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬০ Time View

কলমেঃ শিরিনা আক্তার

পবিত্র কুরআনের প্রথম বাণীই ছিল—“পড়ো, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।” এই ঐশী নির্দেশনা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, মানবজীবনে জ্ঞানার্জনের সূচনা ঘটে পাঠের মধ্য দিয়েই। বেদ, গীতা, বাইবেলসহ পৃথিবীর সব ধর্মগ্রন্থই মানুষকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথে আহ্বান জানিয়েছে। তাই বই কেবল তথ্যের ভাণ্ডার নয়; বই মানুষকে সত্য, সুন্দর ও মানবিক হয়ে উঠতে শেখায়।

বই মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো জ্বালায়—এ কথা নিছক কোনো প্রবাদ নয়, মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত এক চিরন্তন সত্য। সভ্যতার উন্মেষ থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের চিন্তা, চেতনা ও মননের বিকাশ ঘটেছে বইয়ের হাত ধরেই। বই পাঠ মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, অনুভূতিকে শুদ্ধ করে এবং আত্মাকে করে মহীয়ান। যে সমাজে বইয়ের কদর আছে, সে সমাজেই জ্ঞানের আলো দীপ্ত হয়ে জ্বলে, অজ্ঞতার অন্ধকার সেখানে স্থান পায় না।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “বই আমাদের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে।” বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বইকে দেখেছেন জাগরণের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হিসেবে—যা মানুষের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা সাহস, প্রতিবাদ ও মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলে। পাশ্চাত্য দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের অমর বাণী—“Reading maketh a full man”—প্রমাণ করে, পাঠ মানুষকে কেবল শিক্ষিত নয়, পরিপূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত করে।

ইতিহাসের বই আমাদের অতীতের সঙ্গে পরিচয় করায়, জাতির ভুল ও সাফল্যের আয়না ধরে। উপন্যাস মানুষের হৃদয়ে সহানুভূতি ও মানবিক বোধ জাগায়, কবিতা অনুভূতিকে করে কোমল ও সংবেদনশীল, আর প্রবন্ধ চিন্তাকে করে যুক্তিবান ও শাণিত। বইয়ের প্রতিটি পাতা যেন এক একটি জানালা—যার মধ্য দিয়ে মানুষ অজানা পৃথিবীকে দেখে, নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেকে আবিষ্কার করে। যে মানুষ বই পড়ে না, সে যেন আলোর সম্মুখে দাঁড়িয়ে থেকেও চোখ বন্ধ করে রাখে।

আজকের শিক্ষার্থীদের প্রতি রইল বিশেষ আহ্বান—বইকে ভয় নয়, বন্ধু করে নাও। পরীক্ষার গণ্ডির বাইরে এসে বই পড়ো নিজের আনন্দের জন্য, জানার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুললে চিন্তা হবে গভীর, ভাষা হবে সমৃদ্ধ, আর মন হবে উদার ও মানবিক। মনে রেখো, বই পড়া মানুষই জীবনকে বড় চোখে দেখতে শেখে এবং নিজেকে গড়ে তোলে আলোকিত মানুষ হিসেবে।

বই মানুষকে সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্ত করে। এটি মানুষকে সত্য অনুসন্ধানে সাহসী করে তোলে এবং ন্যায়, সৌন্দর্য ও নৈতিকতার পথে এগিয়ে নেয়। তাই বই পাঠ কেবল অবসর বিনোদন নয়—এটি মননের সাধনা, আত্মশুদ্ধির নীরব সাধনা।

এই বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দময়, অনুসন্ধানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আলোচনা, পাঠচক্র, সৃজনশীল কাজ ও মুক্ত চিন্তার সুযোগ তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা বইকে ভয় নয়, ভালোবাসতে শিখবে। তখন শিক্ষা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের প্রস্তুতিতে পরিণত হবে।

পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বহির্পাঠের গুরুত্বও অপরিসীম। পাঠ্যবই জ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ করে, কিন্তু গল্প, জীবনী, বিজ্ঞানভিত্তিক গ্রন্থ, ভ্রমণকাহিনি ও সাহিত্য মানুষের চিন্তাকে বহুমাত্রিক করে তোলে। পাঠ্যবই পরীক্ষায় পাশ করায়, আর বহির্পাঠ জীবনকে বুঝতে শেখায়।

এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকাও অনস্বীকার্য। সন্তানের হাতে বই তুলে দেওয়া, মোবাইলের আসক্তি কমিয়ে পাঠের অভ্যাসে উৎসাহ দেওয়া এবং নিজেরাও বই পড়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।

অতএব বই পাঠ কেবল একটি অভ্যাস নয়—এটি আত্মার বিকাশ, মননের শুদ্ধি এবং মানবিক সভ্যতার মূলভিত্তি। বই-ই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয়, অজ্ঞতা থেকে প্রজ্ঞায়, সীমাবদ্ধতা থেকে অসীম সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নেয়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102