নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ মহানগরী ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি জনসভায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানকে ‘গডফাদার’ আখ্যা দিয়ে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় আয়োজিত এই জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “এই নারায়ণগঞ্জ নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত। এই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডে এক সময় লেখা ছিল—জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের প্রবেশ নিষেধ। যিনি এই নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে গডফাদার মনে করতেন।”
‘মানুষের ইচ্ছা নয়, আল্লাহর হুকুমই চূড়ান্ত’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমি এই রাস্তা দিয়ে বহুবার যাতায়াত করেছি। আসতাম-যেতাম আর সেই সাইনবোর্ড দেখতাম—এই শহরে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ। আজ এখানে আসার পথেও সেই স্মৃতি মনে পড়ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষের কোনো ইচ্ছাই পূরণ হয় না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা তা পূরণ করেন। উনি (শামীম ওসমান) ইচ্ছা করেছিলেন, জামায়াতকে নারায়ণগঞ্জে ঢুকতে দেবেন না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা জামায়াতকেই প্রবেশাধিকার দিয়েছেন, আর তাকেই এই শহরে ঢোকা নিষেধ করে দিয়েছেন।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে কড়া বার্তা
বক্তব্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, “ওনাদের নেত্রীও মনে করতেন ক্ষমতা চিরস্থায়ী। কিন্তু বিস্ময়কর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এই জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন নয়, এটি ইতিহাসের বড় শিক্ষা। এই শিক্ষা জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ—সব দলেরই নেওয়া দরকার।”
‘দম্ভ ও অহংকারের পরিণতি ভয়াবহ’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “কখনো দম্ভ, অহংকার আর আক্রোশে নিজেকে বেপরোয়া ভাবা যাবে না। অসীম ক্ষমতার মোহে ভিন্ন মতের ওপর দমন-পীড়ন চালানো যাবে না। করলে কী পরিণতি হয়, তা জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, “নারায়ণগঞ্জকে দীর্ঘদিন ধরে গডফাদার সংস্কৃতি, সন্ত্রাস, দখল ও চাঁদাবাজির শহর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা এই নারায়ণগঞ্জকে শান্তি ও ইনসাফের শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”
‘ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য’
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গত কয়েকটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। দিনের ভোট রাতে হয়েছে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে।”
তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।”
জনসভায় উপস্থিত নেতাকর্মী ও প্রার্থীরা
জনসভায় নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনীত প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, মহানগর ও জেলা শাখার নেতাকর্মীরা জনসভায় অংশ নেন।
বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা জনসভায় যোগ দেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী এলাকা হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে জামায়াতের এমন জনসভা এবং শীর্ষ নেতার কড়া বক্তব্য আগামী নির্বাচনের রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তাদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের ধারা শুরু হয়েছে, এই জনসভা তারই প্রতিফলন।