
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ-০৩ (সোনারগাঁও–সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে এগারো দলীয় জোটের বিশাল জনসভা কার্যত রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক শক্তির মহড়ায়। বাংলাদেশ জামায়াত ইসলাম মনোনীত এগারো দলীয় জোটের প্রার্থী প্রিন্সিপাল ড. ইকবাল হোসাইন ভূইয়া-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে মানুষের ঢল নামে। শিমরাইল চিটাগাংরোড ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়, যা নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিয়েছে।
বুধবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ জনসভায় নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেন। সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন তারা। ব্যানার, ফেস্টুন, দলীয় পতাকা ও স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। জনসভার বিশাল উপস্থিতি প্রমাণ করে—নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি এখন আর নিছক স্লোগান নয়, এটি জনতার স্পষ্ট উচ্চারণ।
সকাল থেকেই জনস্রোত, এলাকা পরিণত হয় আন্দোলনের মঞ্চে
সমাবেশ শুরুর আগেই শিমরাইল ও চিটাগাংরোড ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। সোনারগাঁও ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মিছিলগুলো সমাবেশস্থলে এসে একত্রিত হলে পুরো এলাকা আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে। “ভোটাধিকার ফিরিয়ে দাও”, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও”, “ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র চাই”— এমন স্লোগানে প্রকম্পিত হতে থাকে আশপাশের সড়ক ও জনপদ।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে জনসভা সফল করতে কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেই প্রস্তুতিকে ছাপিয়ে গেছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কঠোর হুঁশিয়ারি
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এগারো দলীয় জোটের জামায়াত ইসলাম মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী প্রিন্সিপাল ড. ইকবাল হোসাইন ভূইয়া বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে কঠোর ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেন,
“এই দেশ আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও ন্যায়বিচার—সবকিছুই ধ্বংসের মুখে। বছরের পর বছর মানুষ ভোট দিতে পারে না, কথা বলার অধিকার হারিয়েছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যই দশ দলীয় জোট রাজপথে নেমেছে।”
তিনি আরও বলেন,
“নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে, মানুষের মৌলিক অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে। এই আসনকে আর জিম্মি করে রাখা যাবে না। জনগণ এবার জবাব দিতে প্রস্তুত।”
ড. ইকবাল হোসাইন ভূইয়া স্পষ্ট করে জানান, আসন্ন নির্বাচন যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে জনগণ তা মেনে নেবে না। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন,
“নির্বাচনের নামে কোনো প্রহসন চলতে দেওয়া হবে না। ভোট কারচুপি, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা কালো টাকার খেলা—কোনো কিছুই দশ দলীয় জোট মেনে নেবে না। প্রয়োজন হলে রাজপথে আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
বক্তাদের কণ্ঠে আন্দোলনের ডাক
সমাবেশে এগারো দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, এটি গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।
এক বক্তা বলেন,
“নারায়ণগঞ্জ শিল্পনগরী হলেও এখানকার শ্রমিক, সাধারণ মানুষ আজ নিরাপত্তাহীন। চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাস এই জনপদের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে সৎ ও আদর্শবান নেতৃত্ব প্রয়োজন।”
আরেক বক্তা বলেন,
“যারা বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকেও মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি, তাদের বিদায় জানানোর সময় এসেছে। এই জনসভা প্রমাণ করেছে—জনগণ জেগে উঠেছে।”
নারায়ণগঞ্জ-৩: রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আসন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন বরাবরই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সোনারগাঁও ও সিদ্ধিরগঞ্জ—দুটি এলাকাই শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এখানকার ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং যে কোনো নির্বাচনে ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে।
এই জনসভায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করে, দশ দলীয় জোট এই আসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে অত্যন্ত কঠিন।
জনতার প্রত্যাশা ও প্রতিক্রিয়া
জনসভায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা পরিবর্তন চান। এক শ্রমিক বলেন,
“আমরা শুধু ভোট দিতে চাই। আমাদের কথা বলার অধিকার চাই। যে নেতা আমাদের পাশে দাঁড়াবে, আমরা তাকেই সমর্থন দেব।”
একজন প্রবীণ ভোটার বলেন,
“জীবনে অনেক নির্বাচন দেখেছি, কিন্তু ভোট দিতে পারিনি। এবার যদি সঠিকভাবে ভোট দিতে পারি, তাহলে দেশ বদলাবে।”
শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি, কিন্তু বার্তা স্পষ্ট
দীর্ঘ তিন ঘণ্টাব্যাপী জনসভা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। তবে সমাবেশ শেষে উপস্থিত জনতার মুখে মুখে ছিল একটাই কথা—এই আন্দোলন থামবে না। আয়োজকদের দাবি, এটি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে এগারো দলীয় জোটের সবচেয়ে বড় ও সফল জনসভাগুলোর একটি।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় এসেছে, এই জনসভা শুধু একটি নির্বাচনী কর্মসূচি নয়; এটি ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা—জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পেতে প্রস্তুত, প্রয়োজনে রাজপথেই।