বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
কবিতাঃ নেতারা প্রতিশ্রুতি রাত পোহালে নির্বাচন, মানিকগঞ্জ-২ ভোট কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে গেছে ব্যালট পেপারসহ ভোটের সরঞ্জাম আ.লীগের নীরব ভোটেই নির্ধারণ জয়-পরাজয় বাগেরহাটের চার আসনে ত্রিমুখী লড়াই সবক’টিতে মাঠে বিএনপির বিদ্রোহী, বাড়তি সুবিধায় জামায়াত বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী প্রখ্যাত সাহিত্যিক ড. মোঃ বদরুল আলম সোহাগের জন্মদিনের শুভেচ্ছা মোরেলগঞ্জে ৬০ কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তায় ৬ স্তরের বলয়, কেন্দ্রে কেন্দ্রে আনসারের দৌড়ঝাঁপ কবিতাঃ প্রণয় অর্ঘ্যে হৃদয় চাই! কবিতা: বঁধুয়া- কলমে: শিরিনা আক্তার ভোট বনাম নির্বাচন কবিতাঃ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতিক তারেক রহমান

ভোট বনাম নির্বাচন

Coder Boss
  • Update Time : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ Time View

​লেখকঃ ইরি অতন 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ভোট’ এবং ‘নির্বাচন’ শব্দ দুটি সমার্থক হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এদের মধ্যে এক বিস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে ‘ভোট’ হলো তার নাগরিক অধিকারের সর্বোচ্চ প্রয়োগ, আর ‘নির্বাচন’ হলো একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিনিধি নির্ধারিত হয়। বর্তমানে এ দুইয়ের মধ্যকার যে টানাপোড়েন, তা দেশের সর্বস্তরের জনজীবন, রাজনীতি এবং সামাজিক কাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলছে।

​ঐতিহাসিকভাবে এ দেশে নির্বাচন মানেই ছিল এক উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে জনগণের কাছে ‘ভোট দেওয়া’ এবং ‘নির্বাচন হওয়া’ দুটি ভিন্ন মেরুর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোট: এটি ব্যক্তির একক ক্ষমতা। যখন একজন ভোটার ব্যালট পেপারে তার পছন্দের প্রতীকে সিল মারেন, তখন তিনি আসলে তার আগামীর স্বপ্ন এবং নিরাপত্তার আমানত প্রদান করেন।
নির্বাচন: এটি একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা। এটি সফল হওয়ার শর্ত হলো স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং নিরপেক্ষতা।
​বর্তমানে জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ভোটের প্রকৃত আমেজ বা প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বই সমাজের নেতিবাচক ও ইতিবাচক পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

​দেশের সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহে তারা এখন বিশ্বরাজনীতি এবং স্থানীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝেন। তবে এই সচেতনতার পাশাপাশি একটি বড় অংশের মধ্যে ‘রাজনৈতিক উদাসীনতা’ তৈরি হয়েছে।

নেতিবাচক দিক:
ভোটাধিকারের গুরুত্ব হ্রাস: যখন মানুষ মনে করে তার ভোট ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না, তখন সে ভোটকেন্দ্র থেকে বিমুখ হয়। এটি গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি।
অনিশ্চয়তা ও ভয়: নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে সাধারণ মানুষের মনে ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত এবং নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করে।

ইতিবাচক দিক:
নাগরিক সচেতনতা: প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও মানুষ এখন সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে “আমার ভোট আমি দেব” এই আকাঙ্ক্ষাটি নতুন করে জাগ্রত হচ্ছে।

​রাজনীতিবিদরা হলেন গণতন্ত্রের কারিগর। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে ‘ভোট’ এবং ‘নির্বাচন’ নিয়ে ভিন্নধর্মী কৌশল লক্ষ্য করা যায়।
ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি: অনেক ক্ষেত্রে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে জনসেবার চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র বাসনা বেশি দেখা যায়। এতে ‘ভোটের’ চেয়ে ‘নির্বাচনী কৌশল’ বেশি প্রাধান্য পায়।
নেতাকর্মীদের বিচ্ছিন্নতা: অনেক সময় প্রার্থীরা জনগণের দুয়ারে যাওয়ার চেয়ে লবিং বা সাংগঠনিক পেশিশক্তির ওপর বেশি নির্ভর করেন। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় ঘটায়।
​তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। কিছু তরুণ ও আদর্শবান নেতা এখনও বিশ্বাস করেন যে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোট ছাড়া অর্জিত বিজয় আসলে নৈতিকভাবে দুর্বল। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সরাসরি জনগণের সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।

নেতিবাচক প্রভাব: মতাদর্শের পার্থক্যের কারণে পাড়া-মহল্লায় বিভাজন তৈরি হয়।নির্বাচনের অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ থমকে যায়, বাজার অস্থির হয়।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক অস্থিরতা পড়াশোনার ক্ষতি করে।

ইতিবাচক প্রভাব: গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে।স্থিতিশীল নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পলিসি গ্রহণ সম্ভব।ছাত্র রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হয়।

​ভোট ও নির্বাচনের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আনতে হলে নিচের বিষয়গুলো অপরিহার্য:
প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার: নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য সংস্থাকে স্বাধীন ও শক্তিশালী হতে হবে যাতে তারা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে পারে।
রাজনৈতিক সমঝোতা: দলমত নির্বিশেষে একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো প্রয়োজন যে, ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম হবে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক ভোট।
তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ: শুধু ভোটার হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারক হিসেবে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা যখন স্বচ্ছতা ও আধুনিকতার দাবি তুলবে, তখন প্রচলিত কাঠামোর পরিবর্তন বাধ্য হবে।
নৈতিক শিক্ষার প্রসার: রাজনীতি মানেই দখলদারিত্ব নয়, রাজনীতি মানে যে সেবা—এই বোধটি তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।

‘ভোট’ কেবল একটি কাগজের টুকরো নয়, এটি নাগরিকের আত্মসম্মান। আর ‘নির্বাচন’ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। বর্তমান বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার যে ব্যবধান, তা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং সচেতন নাগরিক—সবার। যখন ভোট এবং নির্বাচন শব্দ দুটি জনগণের কাছে আবার একই অর্থ বহন করবে, তখনই সমাজ সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও মানবিক হয়ে উঠবে। নেতিবাচকতাকে পাশ কাটিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের জোয়ার আনতে হলে আমাদের ভোট দেওয়ার পরিবেশ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102