রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:১০ পূর্বাহ্ন

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ

Coder Boss
  • Update Time : শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ Time View

কলমে: শিরিনা আক্তার

গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় নাগরিকের মতামত, অধিকার ও মর্যাদাই সর্বোচ্চ মূল্য পায়। গণতন্ত্রের উপকারী দিকগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারে, সরকারের সমালোচনা করতে পারে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক নির্বাচন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন ও সমান অধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গভেদে বৈষম্য না করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। তৃতীয়ত, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্রের বড় শক্তি। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হওয়ায় শাসকদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। চতুর্থত, গণতন্ত্র শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করে; ফলে রক্তপাত ছাড়াই পরিবর্তন সম্ভব হয়। পঞ্চমত, এটি নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণ বাড়ায়, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক।

বাংলাদেশের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণতন্ত্রকে জাতির মুক্তি ও উন্নতির প্রধান পথ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর ঐতিহাসিক আহ্বান—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বহন করে। অপরদিকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং গণতন্ত্রকে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট—গণতন্ত্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করে।

বিশ্বের বহু মনীষীও গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন। আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছেন—“Government of the people, by the people, for the people।” দার্শনিক অ্যারিস্টটল মনে করতেন, রাষ্ট্র তখনই উত্তম হয় যখন সেখানে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকে। জওহরলাল নেহরু বলেছেন, গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এটি একটি জীবনচর্চা—যেখানে সহনশীলতা ও যুক্তির চর্চা হয়। এসব বাণী প্রমাণ করে, গণতন্ত্র মানবসভ্যতার অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি।

উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানের কথা বলা যায়। এসব দেশে শক্তিশালী সংসদীয় প্রথা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত গণমাধ্যম ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ বিদ্যমান। ফলে তারা অর্থনীতি, শিক্ষা ও মানবাধিকারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গণতন্ত্র সেখানে কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

গণতন্ত্র গঠনে শিক্ষক ও ছাত্রসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যায়বোধ, সহনশীলতা, যুক্তিবাদিতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলেন। শ্রেণিকক্ষে মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ দিলে শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শিখতে পারে। অন্যদিকে ছাত্রসমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। ইতিহাসে দেখা যায়, ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অনেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সফল করেছে। তাই শিক্ষাঙ্গনকে হতে হবে গণতন্ত্রের চর্চাকেন্দ্র।

ধর্মও গণতন্ত্রকে সমর্থন করে। সব ধর্মেই ন্যায়, সমতা, মানবিকতা ও পরামর্শের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্ম মানুষকে সত্যবাদিতা, সহিষ্ণুতা ও অন্যের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়, যা গণতন্ত্রের মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং ধর্মীয় নৈতিকতা গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তি প্রদান করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গণতন্ত্র জাতি গঠনের প্রধান স্তম্ভ। এটি নাগরিককে সচেতন, দায়িত্বশীল ও মর্যাদাবান করে তোলে; রাষ্ট্রকে করে জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নমুখী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা—পরমতসহিষ্ণুতা, আইনের শাসন, সমান অধিকার ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন—একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পূর্বশর্ত। তাই আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য, ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে গণতন্ত্রের আদর্শ ধারণ ও অনুশীলন করা। তাহলেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102