এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গর্ব, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আবারও রক্তচক্ষু দেখছে বনদস্যুদের। একের পর এক অপহরণ, চাঁদা দাবি ও মুক্তিপণের ঘটনায় সাগর ও বনের নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন জেলেরা। এতে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে হাজারো পরিবার মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। দ্রুত দস্যুমুক্ত না হলে রাজস্ব হারাবে বন বিভাগ, বিপর্যস্ত হবে উপকূলীয় অর্থনীতি—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
২০ জেলে অপহরণ, আতঙ্কে দুবলার চর
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রের আওতাধীন আলোরকোল ও নারকেলবাড়িয়া শুঁটকি পল্লী থেকে ২০ জেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পৃথক স্থানে মাছ ধরার সময় জলদস্যু সুমন ও জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা ২০টি ট্রলার থেকে একজন করে ২০ জেলেকে তুলে নিয়ে যায়।
অপহৃতরা হলেন—হরিদাস বিশ্বাস, গোপাল বিশ্বাস, রমেশ বিশ্বাস, প্রশান্ত বিশ্বাস, শংকর বিশ্বাস, তুষার বিশ্বাস, মনিরুল ইসলাম, উজ্জ্বল বিশ্বাস, কালিদাস বিশ্বাস, কাশেম মোড়ল, সাধন বিশ্বাস, শিবপদ বিশ্বাস, রশিদ সরদার, প্রকাশ বিশ্বাস, ইয়াসিন মোড়ল, শিমুল, রূপকুমার বিশ্বাস, গণেশ বিশ্বাস, উত্তম বিশ্বাস ও বাটু বিশ্বাস। তাদের বাড়ি খুলনার পাইকগাছা, কয়রা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায়।
যাওয়ার সময় দস্যুরা ট্রলারে থাকা অন্য জেলেদের কাছে নিজেদের মোবাইল নম্বর দিয়ে যায়—মুক্তিপণের জন্য যোগাযোগের ইঙ্গিত রেখে।
শেলারচরে ৫০ লাখ টাকার চাঁদা দাবি
এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে শেলারচর শুঁটকি পল্লীতে হানা দিয়ে ছয় জেলেকে তুলে নিয়ে যায় বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনী। চার দিনেও তাদের মুক্তি মেলেনি।
পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রের বিশেষ টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেস্ট রেঞ্জার) মিল্টন রায় জানান, অপহৃত ছয় জেলেকে জিম্মি করে শেলারচরের ৫০টি শুঁটকি ঘরের প্রত্যেকটির কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে মোট ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে দস্যুরা। দাবিকৃত টাকা দ্রুত পরিশোধ না করলে জিম্মিদের ছেড়ে দেওয়া হবে না—এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
ফলে জেলে-মহাজনদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। অনেক ব্যবসায়ী দস্যুদের চাঁদা আর মুক্তিপণের টাকা দিতে দিতে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছেন।
‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ—এখন সাগরে ডাকাত’
দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন,
“সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে কয়েকটি দস্যুবাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের দাপটে জেলেদের মাছ ধরার উপায় নেই। অপহরণের ভয়ে কেউ সাগরে যেতে চাচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনী নামে চারটি গ্রুপ বর্তমানে সক্রিয়। মুক্তিপণ দিতে না পারলে জেলেদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আলোরকোলে অবস্থানরত রামপাল জেলে সমিতির সভাপতি মোতাসিম ফরাজী বলেন,
“আগে প্রবাদ ছিল—জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। এখন যুক্ত হয়েছে সাগরে গেলে ডাকাত। গত ১৫ দিনে বহু জেলে অপহৃত হয়েছেন। দস্যুদের কব্জায় এখনো কমপক্ষে শতাধিক জেলে আটক রয়েছেন।”
রাজস্বে বড় ধাক্কা
বনদস্যু আতঙ্কে জেলেরা মাছ ধরার পাস নিতে আসছেন না। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ–এর শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমান বলেন,
“জেলেরা পাস না নেওয়ায় মাসিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।”
শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম ২০ জেলে অপহরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জেলেদের নিরাপত্তায় বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হয়েছে। অপহৃতদের উদ্ধারে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
জীবিকার শেষ ভরসা অনিশ্চিত
দুবলার শুঁটকি পল্লী কেবল একটি মৌসুমি বাজার নয়; এটি হাজারো জেলে ও ব্যবসায়ীর জীবিকার কেন্দ্র। মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে যদি জেলেরা খালি হাতে ঘরে ফেরেন, তবে উপকূলজুড়ে বাড়বে ঋণ ও দারিদ্র্য।
জেলেদের একটাই দাবি—দ্রুত অপহৃতদের উদ্ধার, বনদস্যু দমন এবং নিরাপদ মৎস্য আহরণের পরিবেশ নিশ্চিত করা। নইলে সুন্দরবনের নোনা জলের ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেসে যাবে উপকূলীয় মানুষের স্বপ্ন ও জীবিকা।
যাওয়ার সময় ট্রলারের অন্য জেলেদের কাছে তাদের মোবাইল নম্বর দিয়ে যায় দস্যুরা।
ফরেস্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় আরো বলেন, গত শুক্রবার শেলারচর থেকে অপহৃত ছয় জেলে এখনও জিম্মি রয়েছেন দস্যুবাহিনীর কাছে। দস্যুরা ওই জেলেদের জিম্মি করে শেলারচর শুঁটকি পল্লীর ৫০টি শুঁটকি ঘরের প্রত্যেকটি থেকে এক লাখ টাকা করে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে। শেলারচরের শুঁটকি ব্যবসায়ীরা দ্রুত দাবিকৃত চাঁদা না দিলে জিম্মি জেলেদের ছাড়া হবে না বলে হুমকি দিয়েছে। এ অবস্থায় জেলে-মহাজনরা চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
দুবলা ফিসারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবন ও সাগরে নিরাপত্তা না থাকায় বনদস্যুদের হাতে অপহরণ আতঙ্কে দুবলার চরের হাজারো জেলে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে সাগর ও সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে। জেলেরা এখন চরে অলস সময় কাটাচ্ছেন এবং মৌসুমের শেষে এসে তারা কী নিয়ে বাড়ি যাবেন সে চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনে জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনী নামে বনদস্যুদের চারটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। দস্যুরা বেপরোয়া হয়ে সুন্দরবন ও সাগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জেলেদের ধরে নিয়ে আটকে মুক্তিপণ আদায় করে ছেড়ে দিচ্ছে। যারা টাকা দিতে পারছে না তাদের বেধড়ক মারধর করছে দস্যুরা।দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বনদস্যুদের কয়েকটি বাহিনী সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের দাপটে জেলেদের মাছ ধরার উপায় নেই। অপহরণের ভয়ে জেলেরা সাগরে যেতে চাচ্ছে না। দস্যুদের চাঁদা আর মুক্তিপণের টাকা দিতে দিতে ব্যবসা বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে অনেক ব্যবসায়ীর। এমনকি পেশা ছেড়ে দেওয়ারও চিন্তাভাবনা করছেন অনেকে। অপহৃত জেলেদের দ্রুত উদ্ধার এবং দস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযানের দাবি জানান এই মৎস্যজীবী নেতা।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম ২০ জেলে অপহরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সুন্দরবন ও শুঁটকি পল্লীগুলোর জেলেদের নিরাপত্তায় বনরক্ষীদের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সাগরে অবস্থানরত জেলেদের নিরাপত্তা ও অপহৃত জেলেদের উদ্ধারে কোস্টগার্ড ও নৌ-বাহিনীর সহযোগিতার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
আলোরকোলে অবস্থানরত রামপাল জেলে সমিতির সভাপতি মোতাসিম ফরাজী বলেন, আগে প্রবাদ ছিল জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। এখন এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাগরে গেলে ডাকাত। দস্যুদের তাণ্ডবে মাছ ধরা বন্ধ করা হয়েছে। গত ১৫ দিনের মধ্যে অনেক জেলেকে দস্যুরা অপহরণ করে নিয়ে গেছে। দস্যুদের কব্জায় এখন কমপক্ষে শতাধিক জেলে আটক রয়েছে। সর্বশেষ সোমবার রাতে অপহৃত ২০ জেলের সন্ধান মেলেনি তিন দিনেও।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান বলেন, বনদস্যু আতঙ্কে তাদের স্টেশন অফিস থেকে কোনো জেলে সুন্দরবনে মাছ ধরার পাস (অনুমতি) নিচ্ছেন না। যার ফলে মাসিক রাজস্বের টার্গেটে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে বন দস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং বনরক্ষীরা জেলেদের নিরাপত্তায় কাজ করছেন বলে জানান তিনি।