
কলমেঃ রকি আক্তার
দুনিয়া যখন নিজস্ব অহংকার, প্রতিযোগিতা আর অস্থিরতার উত্তাপে দগ্ধ হতে থাকে, যখন মানুষের চোখে আলো থাকলেও অন্তরে জমে ওঠে অদৃশ্য অন্ধকার, তখন তুমি আসো হে রমজান নীরব অথচ গভীর উপস্থিতি নিয়ে, যেন উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে হঠাৎ নেমে আসা করুণার বৃষ্টি।
চাঁদের ক্ষীণ রেখা আকাশে জেগে উঠতেই আমার ভেতর এক অদৃশ্য কম্পন শুরু হয় মনে পড়ে সেই আগুনের কথা, যা কেবল দেহকে নয়, আত্মার অহংকারকেও ছাই করে দিতে পারে, মনে পড়ে সেই দিনের কথা, যেদিন কোনো পরিচয়, কোনো অজুহাত, কোনো বাহ্যিক সাফল্য কাজে আসবে না শুধু আমল, শুধু নিয়ত, শুধু সত্য।
হে রমজান, তুমি কেবল রোজার ক্ষুধা নও তুমি আত্মার পর্দা সরিয়ে দেওয়া এক গভীর আহ্বান, তুমি নফসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সাধনা, তুমি সেই আয়না যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের দুর্বলতা, ভাঙা নিয়ত আর অপূর্ণতাগুলো স্পষ্ট দেখতে পায়।
সাহরির নীরব প্রহরে, যখন চারদিক স্তব্ধ হয়ে থাকে আর আকাশ যেন খুব কাছে নেমে আসে, তখন আমি টের পাই আমার ভঙ্গুরতা বুঝতে পারি আমি শক্ত নই, আমি পূর্ণ নই, আমি নির্ভুল নই আমি এক নির্ভরশীল বান্দা, যার প্রতিটি শ্বাসও দয়ার দান।
ইফতারের পূর্বমুহূর্তের দীর্ঘ অপেক্ষা আমাকে শিখিয়ে দেয় যে ক্ষুধা শুধু দেহের নয়, আত্মারও আছে এক ফোঁটা পানির মতোই আমি তোমার রহমতের প্রত্যাশী, এক মুহূর্তের ক্ষমার মতোই আমি চিরস্থায়ী মুক্তি খুঁজি, অথচ আমার আমল অল্প, আমার ধৈর্য ক্ষীণ, আমার প্রতিজ্ঞা বারবার ভেঙে যায়।
রাতের নীরবতায়, যখন চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে আয়াতের ধ্বনি শুনি আর হৃদয়ের ভেতর তার প্রতিধ্বনি অনুভব করি প্রতিটি তেলাওয়াত যেন অদৃশ্য ধুলো মুছে দেয় আত্মা থেকে, প্রতিটি সিজদা মনে করিয়ে দেয় যে মাটির কাছেই মানুষের প্রকৃত পরিচয়, আর বিনয়ই তার একমাত্র অলংকার।
জায়নামাজে আমি আর বড় কোনো দাবি তুলি না শুধু বলি হে প্রভু, আমি সীমা লঙ্ঘন করেছি, আমি নিজেকেই হারিয়েছি, আমার ভেতরের সকল ত্রুটি ও অবহেলাকে তুমি সংশোধন করে দাও, আমার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দাও, কারণ তোমার করুণা ছাড়া আমার মুক্তির আর কোনো পথ নেই।
হে দয়াময়, আমি শুধু আগুন থেকে আশ্রয় চাই না আমি চাই তোমার অসন্তোষ থেকে নিরাপত্তা, চাই তোমার নৈকট্যের সেই প্রশান্তি, যা দুনিয়ার সব প্রাপ্তিকে ম্লান করে দেয় যদি আমার লোভ থাকে, তবে তা যেন হয় তোমার সন্তুষ্টির জন্য, যদি আমার ভয় থাকে, তবে তা যেন হয় তোমার বিচ্ছিন্নতার জন্য।
রমজান, তুমি সাক্ষী থেকো এই দহনময় পৃথিবীর ভেতর দাঁড়িয়ে আমি অন্তত একবার সত্যিকারভাবে ফিরে আসতে চেয়েছি, অন্তত একবার সমস্ত অহংকার নামিয়ে রেখে বলেছি, “হে রব, নিজ গুণে ক্ষমা করো,” কারণ আমি জানি, আমার অর্জন নয়, তোমার দয়াই আমার একমাত্র ভরসা।