রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ আমরা মাতৃভাষায় কথা বলছি: এমপি কয়ছর আহমেদ মোরেলগঞ্জে নবনির্বাচিত এমপি অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীমকে গণসংবর্ধনা, মাদক-সন্ত্রাসে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা কবিতাঃ কবির উপকরণ একুশের প্রথম প্রহরে বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ সিলেটের বিশ্বনাথে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন ভালোবাসা চাই, ভালো বাসা চাই, ভালো ভাষা চাই একুশে ফেব্রুয়ারি: রক্তে লেখা মাতৃভাষার শপথ ডিমলায় ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে জামায়াতের দোয়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে জগন্নাথপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ আবুল কালাম তালুকদার’র দুটি কবিতা

একুশে ফেব্রুয়ারি: রক্তে লেখা মাতৃভাষার শপথ

Coder Boss
  • Update Time : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৪ Time View

মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
ভাঙড়, দক্ষিণ ২৪ পরগণা
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি”— এই পংক্তি উচ্চারণমাত্র আমাদের ভিতরে এক অনির্বচনীয় কম্পন জেগে ওঠে। এই অমর গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী যখন এই গান লিখেছিলেন, তখন তিনি কেবল একটি দিনের শোকগাথা লেখেননি; লিখেছিলেন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। ভাষা যে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা যে আত্মমর্যাদা, ভাষা যে স্বাধীনতার ভিত্তি তার রক্তমাখা দলিল হয়ে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি।

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অনেক তারিখ আছে, কিন্তু সব তারিখ মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকে না। কিছু দিন ক্যালেন্ডারে থাকে, কিছু দিন স্মৃতিতে; আর কিছু দিন রক্তে। একুশে ফেব্রুয়ারি সেই তৃতীয় শ্রেণির দিন— যে দিনটি কেবল স্মরণ নয়, শপথের দিন; কেবল ইতিহাস নয়, বিবেকের দিন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর জন্ম নেয় পাকিস্তান রাষ্ট্র। ভৌগোলিকভাবে দুই প্রান্তে বিভক্ত— পূর্ব ও পশ্চিম। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বললেও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। রাজনৈতিক আধিপত্যের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু হয়। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা ছিল কেবল ভাষানীতির প্রশ্ন নয়; ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ তখন বুঝেছিল— ভাষা হারালে জাতিসত্তা হারাবে। ১৯৪৮ সালে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। তাদের দাবি ছিল স্পষ্ট: উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে। এই দাবির পেছনে ছিল না কোনও বিদ্বেষ; ছিল ন্যায্য অধিকারবোধ।

১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে সরকার পুনরায় ঘোষণা করল— উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। উত্তাল হয়ে উঠল ছাত্রসমাজ। একুশে ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদের ডাক দেওয়া হল। এর আগেই জারি করা হল ১৪৪ ধারা। কিন্তু ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত আছে, যখন নিষেধাজ্ঞা মানুষের বিবেককে থামাতে পারে না।

সে দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনায় ভরা। তরুণ ছাত্ররা স্লোগান তুলছিল—“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।” পুলিশ লাঠিচার্জ করল, কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হল। তবু মিছিল থামেনি। অবশেষে গুলি। নির্মম, নির্দয় গুলি। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর—আরও কত নাম না-জানা তরুণ। রক্তে লাল হয়ে উঠল ঢাকার রাজপথ।

এই রক্তপাত ছিল না হঠকারী উন্মাদনা। ছিল সুসংগঠিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মবলিদান। শহীদদের নিথর দেহের পাশেই জন্ম নিল এক অমোঘ সত্য— ভাষার জন্য জীবন দেওয়া যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির বিরল।

পরদিনই ছাত্ররা গড়ে তুলল প্রথম অস্থায়ী শহীদ মিনার। পরে সেই স্মৃতিকে স্থায়ী রূপ দিল শহীদ মিনার। এই মিনার কেবল স্থাপত্য নয়; এটি প্রতিরোধের প্রতীক, ভাষাপ্রেমের শপথস্তম্ভ।

অবশেষে ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। ভাষা আন্দোলনের চেতনা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত গড়ে দেয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পেছনে একুশের রক্তাক্ত স্মৃতি ছিল এক প্রধান প্রেরণা।

কিন্তু একুশের তাৎপর্য কেবল একটি দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি। ১৯৯৯ সালে UNESCO একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি পায় ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ। আজ পৃথিবীর নানা দেশে এই দিন পালন করা হয় ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের সম্মানে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়— আমরা কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় একুশকে স্মরণ করছি? ফুল দিচ্ছি, গান গাইছি, প্রভাতফেরি করছি। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি মাতৃভাষাকে? শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজির আধিপত্য ক্রমশ বাড়ছে। বাংলা মাধ্যমে পড়া ছাত্রদের অনেক সময় দ্বিতীয় সারির বলে দেখা হয়। অফিস-আদালতে, উচ্চশিক্ষায়, প্রযুক্তির ভাষায় বাংলা এখনও প্রান্তিক।

ভাষা আন্দোলনের মূল শিক্ষা ছিল আত্মমর্যাদা। মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা, চিন্তা ও সৃষ্টির স্বাধীনতা না থাকলে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। যে জাতি নিজের ভাষাকে সম্মান করে না, সে জাতি আত্মবিশ্বাস হারায়।

একুশের শপথ তাই আজও প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রয়োজন আবেগ নয় শুধু, প্রয়োগ। বিদ্যালয়ে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করা, প্রশাসনে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা, ডিজিটাল জগতে বাংলা কনটেন্ট সমৃদ্ধ করা এসবই একুশের প্রকৃত পালন।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের শেখায়— সংগ্রাম কখনও বৃথা যায় না। কয়েকজন তরুণের রক্ত একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। আজ যখন বিশ্বায়নের চাপে ছোট ভাষাগুলি বিলুপ্তির পথে, তখন একুশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভাষা রক্ষা মানে সংস্কৃতি রক্ষা, আত্মপরিচয় রক্ষা।

আমরা যারা বাংলা ভাষায় স্বপ্ন দেখি, ভাবি, ভালোবাসি— তাদের কাছে একুশ কেবল স্মৃতিচারণ নয়; এটি দায়িত্বের দিন। আমাদের প্রতিটি উচ্চারণে, প্রতিটি লেখায়, প্রতিটি শিক্ষাপ্রচেষ্টায় যেন শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষিত হয়।

হে অমর একুশে, তোমায় ভুলিনি, ভুলব না— এই উচ্চারণ যেন কেবল আবেগের ঢেউ না হয়ে ওঠে; হয়ে উঠুক কর্মের প্রতিজ্ঞা।

একুশের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখি—এটি মূলত তরুণদের আন্দোলন। ছাত্ররা এগিয়ে এসেছিল বলেই ভাষা প্রশ্নটি সর্বজনীন রূপ পেয়েছিল। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষ—সকলেই ধীরে ধীরে যুক্ত হয়েছিলেন। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন ছিল সমাজের সম্মিলিত চেতনার জাগরণ।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই চেতনার পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন। কারণ ভাষা কেবল সাহিত্যচর্চার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রশাসন সব ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা শিশুদের চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়ক— এ কথা বহু আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রমাণিত। তবু আমরা প্রায়ই নিজেদের ভাষাকে অবমূল্যায়ন করি, যেন উন্নতির একমাত্র পথ বিদেশি ভাষায়।

এখানে একুশ আমাদের আত্মসমালোচনা শেখায়। আমরা কি বাংলা ভাষায় পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা করছি? প্রযুক্তির পরিভাষা কি সহজভাবে বাংলায় নির্মাণ করছি? সামাজিক মাধ্যমে বাংলা কি শুদ্ধ ও সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করছি? যদি না করি, তবে একুশের কাছে আমাদের দায় রয়ে যায়।

একুশের চেতনা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে। ১৯৫২ সালে যে তরুণেরা প্রাণ দিয়েছিলেন, তারা কেবল মুসলিম বা হিন্দু ছিলেন না; তারা ছিলেন বাঙালি। ভাষা তাদের একসূত্রে বেঁধেছিল। এই ঐক্যের পাঠ আজও জরুরি, যখন বিভেদের রাজনীতি সমাজকে খণ্ডিত করতে চায়।

কলকাতার বুকে দাঁড়িয়েও একুশ আমাদের সমানভাবে স্পর্শ করে। কারণ ভাষার টান ভৌগোলিক সীমানা মানে না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যেমন গর্বের সঙ্গে বাংলা ভাষা বহন করে, তেমনি বাংলাদেশেও বাংলা আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের ভিতরেই একুশের প্রকৃত সার্থকতা।

আজ যখন আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিই, তখন মনে রাখা দরকার— শহীদরা ফুলের জন্য প্রাণ দেননি; দিয়েছেন অধিকার ও মর্যাদার জন্য। সেই মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব এখন আমাদের। বাংলা ভাষাকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপযোগী করে গড়ে তোলা, বিশ্বমঞ্চে তার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা— এটাই একুশের উত্তরাধিকার।

ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে, প্রতিবাদ মানে ধ্বংস নয়; প্রতিবাদ মানে নির্মাণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখা। একুশের রক্ত সেই স্বপ্নের বীজ বপন করেছিল। আজ আমাদের কাজ সেই বীজকে বৃক্ষে পরিণত করা।

হে অমর একুশে, তোমার রক্তমাখা ইতিহাস আমাদের কাঁদায়, আবার সাহসও দেয়। আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা হারালে সব হারায়। তাই তোমার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় কখনও আপস করব না।

এই প্রতিজ্ঞাই হোক আমাদের প্রাত্যহিক চর্চা। এই দায়বোধই হোক আমাদের উন্নতির ভিত্তি। তাহলেই একুশ কেবল অতীতের গৌরব নয়, বর্তমানের শক্তি ও ভবিষ্যতের দিশারি হয়ে থাকবে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102