
শাকেরা বেগম শিমু, মিশিগান, আমেরিকা থেকে:
নদী বলতে কি বুঝি আমরা? বর্ণবিহীন স্বচ্ছপানির বয়ে চলা এক স্রোতসিনী ধারা, যা উৎপন্ন হয়েছে সুউচ্চ কোন পাহাড় বা পর্বত থেকে এবং গিয়ে শেষে মিলিত হয়েছে কোন অথই সাগর বা মহাসাগরে। কিন্তু যদি বলি একটি নদীতে একটা দুটো নয় পুরো রংধনুর সাত সাতটি রং এর পানিই একই সাথে প্রবাহিত হয়, তবে এটি কি কারো বিশ্বাস হবে, বলো? হ্যাঁ আজ এমনই এক আশ্চর্য্য ও নয়নাভিরাম নদীর কথা আমরা জানবো যেটাকে সমগ্র পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী বলে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। অনেকে এর নাম দিয়েছেন “রংধনু নদী” কেননা এটাতে দূর আকাশে আঁকা রামধনু বা রংধনুর সাতটি রং ই বিদ্যমান রয়েছে। কেউ কেউ আবার একে তরল রংধনু বলেও অভিহিত করে থাকেন। আর এতোক্ষণ যে বিচিত্র ও আশ্চর্য্য নদীটির কথা আমরা জানলাম সেই চোখধাঁধানো নয়নাভিরাম নদীটির নাম হচ্ছে “ক্যানু ক্রিস্টেলস”। চলুন এবার এ অসাধারন নদীটি সম্পর্কে বিস্তারিত সবকিছু জেনে নেওয়া যাক।
অবস্থান: এ নদীটি অবস্থিত উত্তর আমেরিকার একটি দেশ “কলোম্বিয়া” তে। কলোম্বিয়া দেশের মেটা নামক প্রদেশের ‘সেরেনিকা’ অঞ্চলের ‘ডি লা ম্যাকারেনা’ নামক একটি জায়গায় হচ্ছে এই অসাধারণ সুন্দর নদীটির অবস্থান।সেই অঞ্চলের স্থানীয় লোকেরা একে “স্বর্গ থেকে প্রবাহিত নদী” বলে অভিহিত করে থাকে। তাছাড়া এই নদীতে মাছ বা অন্য কোন জলজ প্রাণীর বাস নেই সেজন্য যেকোন পর্যটক এখানে এসে স্বচ্ছন্দে এই নদীতে সাঁতার কেটে এর আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। এবং এ নদীটি যে জায়গায় অবস্থিত সেটা কিন্তু খুবই দুর্গম স্থান। সেখানে যাওয়ার কোন যানবাহন নেই। অনেক লম্বা পথ শুধু পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু তবুও প্রতিবছর এখানে অনেক ভ্রমণপিপাসু পর্যটক আসেন স্বর্গীয় এই নদীর সুধা পান করতে। এই তরল রংধনু নামক সাত রং এর রঙিন নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে।
উৎপত্তিস্থল: এই “ক্যানু ক্রিস্টেলস” নামের (রেইনবো রিভার) টি আসলে কোন প্রধান নদী নয়। এটি হচ্ছে মূলত “গায়াবেরো” নামে এক নদী থেকে উৎপন্ন একটি শাখা নদী। এ নদী যে জায়গায় অবস্থিত প্রত্নতাত্ত্বিকদের হিসেবমতে সে জায়গা প্রায় ১০০ কোটি বছরের চেয়েও বেশি পুরানো স্থান। তাই একে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম স্থানগুলোর একটি বলে বিবেচনা করা হয়। যে স্থানটি পার হয়ে এই নদীটির দেখা মেলে সে স্থানটিকে বলে “গায়ানার বর্ম”। তাছাড়া বাহারী রং এর জন্য অনেকে এই নদীকে রঙের স্বর্গও বলে থাকে।
ভিন্ন রঙের কারণ: কলোম্বিয়া’র এই রঙিন নদীতে প্রায় রংধনুর সাতটি রং ই মিশে রয়েছে। এখানে লাল, নীল, বেগুনী, গোলাপী, হলুদ, কালো ও ধূসর রং এর পানি দেখা যায়। এ নদীর নিম্নভাগে রয়েছে একপ্রকার রঙিন জলজ গুল্ম উদ্ভিদ যার নাম হচ্ছে -“ম্যাকারেনিয়া ক্লাভিগেরা”। আর এই গাছ লাল, নীল,কমলা, হলুদ, সবুজ ইত্যাদি অনেকগুলো রঙ এর হয়ে থাকে। আর সেজন্য নিচের গুল্মগুলো বিভিন্ন রঙের হওয়ার দরুণ ও সূর্যের আলোর উপর ভিত্তি করে উপরের স্বচ্ছ পানিও নিজ রং পরিবর্তন করে সেই রং ধারণ করে। কোন কোন স্থানে পানির নিচে কোন জলজ উদ্ভিদ থাকে না। সেখানে পড়ে থাকে শুধু বালি। এই বালিতে সূর্যের আলো পড়ে সেটা হয়ে যায় গাঢ় হলুদ।সে হলুদ বালি থাকার জন্য উপরের স্বচ্ছ পানিও হলুদ বর্ণ ধারণ করে। নদীর স্থানে স্থানে আবার কয়েক মিলিয়ন বছরের পুরানো বড় বড় খনিজ পাথর থাকায় এর সৌন্দর্য্যে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। কখনোবা কয়েক মিলিয়ন বছরের পুরানো এই পাথরগুলো নিজের রং পাল্টে ধূসর বর্ণ ধারণ করে আর যার ফলে তার উপরের স্বচ্ছ পানিও দেখতে ধূসর দেখায়। তাই আসলে এই পানির নিজস্ব কোন রং নেই। এটাও অন্যান্য নদীর মতোই স্বচ্ছ পানির নদী। কিন্তু প্রকৃতির এই খেয়ালে জলের নিচের বিভিন্ন রঙের জলজ উদ্ভিদ, পানির নিচের স্বচ্ছ হলুদ বালি ও সূর্যের আলোর সাথে বিক্রিয়া করে এই পানি রংধনুর সাতরং এ রঙিন হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়। সেই থেকে এই নদীর নামটাই হয়ে গেছে “রংধনু নদী”। আসলে এই সবই হলো রহস্যময় প্রকৃতির খেলা ও মহান আল্লাহর পাকের কুদরতের নমুনা।