বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৪০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
জগন্নাথপুর উপজেলা রক্তদান সংস্থার অভিষেক ও রমজানের ক্যালেন্ডার বিতরণী অনুষ্ঠিত আল আমিন মিশন চ্যারেটি সংগঠনের উদ্যোগে ও জামাল উদ্দিন বেলালের সার্বিক তত্ত্বাবধানে মাহিমা পার্টি সেন্টারে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত কবিতা: কদবানু আলেয়ার চিঠি ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিএনপি নেতা জামাল হোসেন কবিতাঃ চেতনায় ফাগুন সিলেট-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদির লুনা’কে জাতীয় মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের অভিনন্দন দখলদারী-চাঁদাবাজী ও মাদকের সাথে জড়িতরা দলের কেউ হতে পারে না, সাথে সাথে ব্যবস্থা- এমপি লুনা সিলেটের বিশ্বনাথে ‘রাজার খাল’র পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করলেন এমপি লুনা খুলনায় সি ইউ সি স্কুলের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকিরকে জাতীয় মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের অভিনন্দন

মফস্বল সাংবাদিকতায় ঝুঁকি বেশি: সত্যের পথে সংগ্রাম, গণমাধ্যমের দায়িত্ব ও তৃণমূল বাস্তবতার নির্মম চিত্র

Coder Boss
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২২ Time View

এস.এম.সাইফুল ইসলাম কবির
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়শই অবহেলিত অধ্যায় হলো মফস্বল সাংবাদিকতা। রাজধানী বা মহানগরের ঝলমলে মিডিয়া কাঠামোর বাইরে, জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকরাই মূলত দেশের প্রকৃত বাস্তবতার নীরব ইতিহাস রচনা করেন। তাদের কলমে উঠে আসে নদীভাঙন, জলবায়ু সংকট, স্থানীয় দুর্নীতি, সামাজিক অবিচার, প্রান্তিক মানুষের কান্না, উন্নয়ন বৈষম্য এবং অজস্র অপ্রকাশিত সত্য।
কিন্তু এই সত্য তুলে ধরার পথ মোটেও সহজ নয়। বরং মফস্বল সাংবাদিকতা আজ এক ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে, যেখানে পেশাগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং আইনি ঝুঁকি প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—তৃণমূলের এই সাহসী সংবাদযোদ্ধাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা কতটা কার্যকর?
মফস্বল সাংবাদিকতা: গণতন্ত্রের শিকড়ের কণ্ঠস্বর
মফস্বল সাংবাদিকরা মূলত দেশের তৃণমূল বাস্তবতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী। তারা গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, কৃষকের দুর্দশা, জেলেদের সংকট, পরিবেশ বিপর্যয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম এবং সামাজিক অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন।
রাজধানীর সাংবাদিকরা যেখানে বড় নীতিনির্ধারণী ইস্যু নিয়ে কাজ করেন, সেখানে মফস্বল সাংবাদিকরা মানুষের প্রতিদিনের বাস্তব জীবনকে সংবাদে রূপ দেন। তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে একটি সমাজের ভেতরের সত্য, অবহেলা ও সম্ভাবনা দৃশ্যমান হয়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তৃণমূল সাংবাদিকতার ভূমিকা অপরিসীম। কারণ স্থানীয় দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি ঘটে প্রান্তিক পর্যায়ে, যা অনেক সময় জাতীয় গণমাধ্যমের নজরের বাইরে থেকে যায়। এই শূন্যস্থান পূরণ করেন মফস্বল সাংবাদিকরাই।
ঝুঁকির বহুমাত্রিক বাস্তবতা
মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো ঝুঁকি। এই ঝুঁকি শুধু শারীরিক নয়; মানসিক, সামাজিক, আইনি ও অর্থনৈতিক—সব দিক থেকেই তারা ঝুঁকির মুখে থাকেন।
১. শারীরিক হামলা ও ভয়ভীতি
স্থানীয় পর্যায়ে কোনো দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অনিয়ম, অবৈধ দখল বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের হুমকি, হামলা বা হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের ওপর সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, এমনকি পরিবারকেও হুমকির মুখে ফেলা হয়।
মফস্বল এলাকায় ক্ষমতার কাঠামো অনেক সময় কেন্দ্রীভূত থাকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে। ফলে সত্য প্রকাশ মানেই অনেক সময় সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি।
২. রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাব
স্থানীয় রাজনীতি মফস্বল সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো সংবাদ যদি রাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সাংবাদিককে দলীয় চাপ, অপপ্রচার কিংবা পেশাগতভাবে একঘরে করার চেষ্টা করা হয়।
এতে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং অনেক সময় সত্য প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
৩. আইনি ঝুঁকি ও হয়রানি
মফস্বল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, আইনি নোটিশ বা প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগও নতুন নয়। অনেক সময় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা বা অন্যান্য আইনি চাপ সৃষ্টি করা হয়, যা তাদের পেশাগত ও মানসিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।
৪. সামাজিক ও মানসিক চাপ
ছোট শহর বা গ্রামীণ সমাজে সাংবাদিকরা সবার পরিচিত। ফলে কোনো সংবাদ প্রকাশ করলে সামাজিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়ে। অনেক সময় আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন কিংবা স্থানীয় সমাজের চাপও সাংবাদিকদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন করে তোলে।
এই সামাজিক চাপ মানসিকভাবে সাংবাদিকদের বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
আর্থিক অনিশ্চয়তা: পেশার বড় সংকট
মফস্বল সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ নিয়মিত বেতন, ভাতা বা প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ছাড়াই কাজ করেন। অনেকেই নামমাত্র সম্মানী কিংবা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সংবাদ সংগ্রহ করেন।
এই আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের পেশাগত স্বাধীনতাকে দুর্বল করে। জীবিকার চাপের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকতা পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের অভাব, যাতায়াত খরচ, তথ্য সংগ্রহের ব্যয়—সবকিছুই তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করতে হয়, যা পেশাটিকে আরও কঠিন করে তোলে।
প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতি
জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই মফস্বল সাংবাদিকদের ওপর নির্ভর করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা বা আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করলেও তারা পূর্ণাঙ্গ কর্মীর মর্যাদা পান না।
ফলে কোনো বিপদে পড়লে তারা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন, যা সাংবাদিকতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নতুন চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য, ট্রোলিং এবং অনলাইন হুমকি এখন মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য নতুন ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোনো সংবেদনশীল সংবাদ প্রকাশ করলে সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান বা বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালানো হয়, যা তাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ঝুঁকি আরও বেশি
মফস্বল এলাকায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কারণ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ সীমিত, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নজরদারি বেশি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তীব্র।
তারপরও অনেক সাহসী সাংবাদিক অবৈধ বন উজাড়, বালু উত্তোলন, দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা, ভূমিদখলসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন। তাদের এই ভূমিকা সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব: তৃণমূল সাংবাদিকদের সুরক্ষা
গণমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাই মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব।
১. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
মাঠপর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট, নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং আইনি সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।
২. ন্যায্য পারিশ্রমিক ও পেশাগত মর্যাদা
মফস্বল সাংবাদিকদের নিয়মিত সম্মানী, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। এতে তাদের পেশাগত স্বাধীনতা ও মানসিক স্থিতি বৃদ্ধি পাবে।
৩. প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন
আধুনিক সাংবাদিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সাংবাদিকতা শিক্ষা, তথ্য যাচাই পদ্ধতি এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রয়োজন।
রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়
মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা
আইনি সুরক্ষা জোরদার করা
প্রেস আইডি ও পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করা
স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা বৃদ্ধি
সাংবাদিকবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন
নৈতিক সাংবাদিকতা ও দায়িত্ববোধ
ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মফস্বল সাংবাদিকদের পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া—এই চারটি বিষয়ই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি।
বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতা সমাজে আস্থা সৃষ্টি করে এবং গণমাধ্যমের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
উপসংহার: সত্যের পথে অদম্য সংগ্রাম
মফস্বল সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সত্য ও সমাজের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা। সীমাহীন ঝুঁকি, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মধ্যেও মফস্বল সাংবাদিকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তাদের কলমে উঠে আসে দেশের বাস্তব চিত্র, তাদের সাহসে উন্মোচিত হয় অনিয়ম, তাদের দায়বদ্ধতায় শক্তিশালী হয় গণতন্ত্র।
অতএব, মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি পেশাকে রক্ষা করা নয়—বরং সত্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
গণমাধ্যম যদি তৃণমূল সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ায়, রাষ্ট্র যদি তাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে, এবং সমাজ যদি তাদের সম্মান দেয়—তবেই একটি নিরাপদ, স্বাধীন ও শক্তিশালী সাংবাদিকতা পরিবেশ গড়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মফস্বল সাংবাদিকতার ঝুঁকি যতই বেশি হোক, সত্যের আলো নিভে যায় না। কারণ প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু সাহসী মানুষ আছেন, যারা ভয়কে জয় করে কলম হাতে তুলে নেন মানুষের কথা বলার জন্য, সমাজের কথা বলার জন্য, এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তাদের এই সংগ্রামই গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি, আর তাদের নিরাপত্তাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের ভবিষ্যৎ।

লেখক :এস.এম.সাইফুল ইসলাম কবির চেয়ারম্যান জাতীয় মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ঢাকা।
01711377450
Smsaifulpress24@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102