
কলমেঃ সাহেলা সার্মিন
তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রথম শতাব্দী। একবিংশ শতাব্দীর হাঁটি হাঁটি পা পা করে পঁচিশ বছর চলে গেল প্রায়। আমরা হয়েছি অনেক উন্নত। হয়েছে সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা দিক্ষা, অন্ন বস্ত্র, বাসস্থান ; পাল্টেছে আমাদের খোলস।এখন গ্রামেও রাস্তা ঘাটে সোঁদা মাটির গন্ধ নাই, নাই পুকুরে দৌড় ঝাপ। হারিকেন আর কুপী বাতি ছেলেমেয়েরা এখন চিনেনা। ইন্টারনেট, কম্পিউটার আর মোবাইল ফোনের যত্রতত্র ব্যবহারে এখন মানুষ ও মানুষকে চিনেনা প্রায়।সে যাগগে, ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়াতো পেয়েছে দেশ জুড়ে।
যা বলছিলাম, পাল্টেছে আমাদের খোলস। অর্থাৎ মানুষ এখন আর সহজ সরল নেই। উন্নত জীবন যাত্রার তাগিদে আজকাল মানুষ যে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তার চাই টাকা! একজন ছাত্র -ছাত্রী থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত টাকার পিছনে ঘুরছে। সৎ হোক কিংবা অসৎ হোক নেমে পড়ছে টাকার ধান্দায়। ছাত্র ছাত্রীরাও অতি আধুনিক এবং ফ্যাসনেবল জীবন যাত্রার জন্য, তাকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য টাকার পেছনে ছুটছে, অর্থাৎ টাকাওয়ালার বিছানায় নিজেকে সপে দিচ্ছে। অথবা ফেবুকে কারো সাথে চিটিং করছে। ছেলে মেয়েকে,মেয়ে ছেলেকে। হর হামেশাই এগুলো হচ্ছে।
রাজনীতির চাকাও ঘুরছে টাকায়।এখন নির্বাচন করতে গেলেই বস্তুাভর্তি টাকা নিয়ে নামতে হয়। সেখানে নমিনেশনে বিরাট অংক,৷ রাজি খুশি করতে হয় মুষ্টিমেয় লোভাতুর জনগণকে; আর কিছু পাতিনেতাদের পকেটে। এভাবে না হলে আতুর ঘরেই শেষ হবে পদ পদবি। এতো খরচ করে যখন সে ক্ষমতায় আসে তখন তার মন চষে বেড়ায় সে টাকার মায়ায়। জনগণের উপকারের ধান্দা যায় উবে, উসুল করে নিতে চায় ক্ষতি পূরণ।
চাকুরির বাজারও এর ব্যতিক্রম নয়। ১০/২০/৩০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে চাকুরী হচ্ছে অনেকের, বিশেষ করে প্রসাশনিক পদগুলোতে। যেখানে জনগণের সেবক হওয়ার কথা তারা, অথচ উল্টো জনগণকে করে তোলে দিশেহারা। এই যে মানুষের বিবেক বোধ ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে অতল গহব্বরে। ভালো মন্দ হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ছে মানুষ। যে যেটা করে বেড়ায় সেটাই তার সর্বোচ্চ বুঝ। কারো কথাই সে নিবেনা, নিবে না কোনো উপদেশ।
” আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়,
লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয় “।
এই বাক্য এখন আর খাটে না। প্রত্যেকেই নিজেকে বড় মনে করে। নিজের বড়ত্বের জাহির করে বেড়ায়। বয়সে ছোটো, অনভিজ্ঞ হলেও বয়োজ্যেষ্ঠের সাথে পাল্লা দিতে যায়, বেয়াদবি করে। এদের বিবেকবোধ জাগ্রত হোক।
আজকাল সাহিত্যেও যেমন ছড়িয়েছে ফেক তেমনই হিংসা। যেখানে কবি সাহিত্যিকদের লেখায় ভেসে উঠবে সমাজের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত, অপঘাত, অনৈতিকতা ; সেখানে নিজেই নীতিহীনতার বেড়া বুনন করে। হিংসা বিদ্বেষে জর্জরিত কিছু কিছু কবির মন। তারা সমাজের ক্ষত চোখে দেখে না, ক্ষত করে আরেক লেখকের অন্তর! ধীক্ সেই সব কবি লেখকদের যারা সাহিত্যের সম্মান বোঝে না।একজন কবি বা লেখককে ছোটো করা মানে গোটা সাহিত্যকে ছোটো করা। মাইকেল, জীবনানন্দ, রবি, নজরুল,ইলিয়ট, মিল্টন, হোমার, সেক্সপিয়ার এরা প্রত্যেকেই একে অপরের লেখার সম্মান করতেন।নিজেদের লেখা অন্য জনের নামে উৎসর্গ করতেন। কতো মধুর সম্পর্ক ছিলো তাদের! আর আমাদের চিন্তা চেতনার কেনো এত অবনতি বুঝতে পারি না।
উল্লেখ্য, নজরুল যখন আলীপুর সেণ্ট্রাল জেলে বন্দী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ তার ” বসন্ত ” গীতিনাট্য তাকে উৎসর্গ করেন।( ২২ জানুয়ারি ১৯২৩)। আবার কাজী নজরুল ইসলাম তার কাব্য সংকলন “সঞ্চিতা” রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। এ কাব্য সংকলনে ৭৮ টি কবিতা সংকলিত হয়েছে।
এরূপ মাইকেল মধুসূদন দত্তের “মেঘনাদ বধ” কাব্য রাজা দিগম্বর মিত্রকে উৎসর্গ করেন। তদ্রুপ জীবনানন্দ দাশ তার ” ধূসর পাণ্ডুলিপি ” বুদ্ধদেব বসুকে উৎসর্গ করেন। এদের মন মানসিকতা কতো উন্নত ছিলো, ভাবতেই ভালো লাগে।
লোকে বলে চোরে চোরে পিসতুতো ভাই। আমি বলি, কবি কবি মাসতুতো ভাই কবে হবে?কবে এদের মন উদার হবে? আল্লাহ সবার মন মানসিকতা সুস্থ করে দিন,ভালো করে দিন,উন্নত করে দিন। সবাই ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন, বাহিরের খোলস আর ভিতরে সুন্দরের চর্চা করুন।