
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
ভাঙড়, দক্ষিণ ২৪ পরগণা
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
রমজান কেবল রোজার মাস নয়। এ মাস আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কান্নার মাস। গোপন আরজির মাস। অন্তরের আর্তনাদকে আকাশে তুলে ধরার মাস। এটি এমন এক বরকতময় সময়, যখন বান্দা ও রবের দূরত্ব কমে আসে। আসমানের দরজাগুলো খুলে যায়। রহমতের ধারা নেমে আসে নিরবধি।
মহান আল্লাহ আল-কুরআন-এ ঘোষণা করেছেন:
“আর যখন আমার বান্দারা তোমার কাছে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দাও) আমি তো নিকটবর্তী। আমি দো‘আকারীর দো‘আ কবুল করি যখন সে আমাকে ডাকে।”— সূরা আল-বাকারা, (২:১৮৬)
লক্ষ্য করুন, এই আয়াতটি রমজানের রোজার বিধান সংক্রান্ত আয়াতসমূহের মাঝখানে এসেছে। আল্লাহ যেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন—রমজান মানেই দু’আ। রমজান মানেই আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সংযম নয়; এটি আত্মাকে প্রস্তুত করে, হৃদয়কে নম্র করে, চোখকে অশ্রুসিক্ত করে যাতে দু’আ হয় প্রাণস্পর্শী, হয় কবুলযোগ্য।
প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “তিন ব্যক্তির দু’আ প্রত্যাখ্যাত হয় না— রোজাদারের দু’আ ইফতার পর্যন্ত, ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু’আ এবং মজলুমের দু’আ।”
— সুনান আত-তিরমিজি
এই হাদিস আমাদের সামনে এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। একজন রোজাদার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের নফসকে সংযত রাখে, তখন তার প্রতিটি নিঃশ্বাস ইবাদত, প্রতিটি ধৈর্য সওয়াব। আর সেই অবস্থায় তার দু’আ আল্লাহর দরবারে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত।
রমজানে কেন দু’আ বেশি কবুল হয়?
প্রথমত, এ মাস রহমতের মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের প্রথম দশ দিন রহমত, দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাত এবং শেষ দশ দিন নাজাতের অর্থাৎ জাহান্নাম থেকে মুক্তির। অর্থাৎ পুরো মাসজুড়ে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ অব্যাহত থাকে।
দ্বিতীয়ত, এ মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে রমজান এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা হয় এবং শয়তানকে বন্দি করা হয়। ফলে গুনাহের প্ররোচনা তুলনামূলক কমে যায়। হৃদয় হয় বেশি পবিত্র। আর দু’আ হয় বেশি খাঁটি।
তৃতীয়ত, রমজান হলো আল-কুরআন নাজিলের মাস। সূরা আল-বাকারা (২:১৮৫)-এ আল্লাহ বলেছেন, “রমজান মাস— এ মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত।” কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা মানে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা। আর যখন সম্পর্ক গভীর হয়, তখন প্রার্থনাও হয় আন্তরিক, গ্রহণযোগ্য।
বিশেষ করে লাইলাতুল কদর— যে রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এই রাতে করা একটিমাত্র খাঁটি দু’আ হতে পারে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণ। হাদিসে এসেছে, কেউ যদি এই রাতে ঈমান ও সওয়াবের আশায় ইবাদত করে, তবে তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। সুতরাং এই রাতগুলোতে দু’আর শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তবে শুধু সময়ই নয়, দু’আর আদবও গুরুত্বপূর্ণ।
দু’আ করার আগে আল্লাহর প্রশংসা করা, দরুদ শরিফ পড়া, কিবলামুখী হওয়া, বিনয় ও অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে প্রার্থনা করা— এসব দু’আ কবুলের উপায়। হালাল উপার্জন, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের হক আদায় করাও দু’আ কবুলের শর্তগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
রমজান আমাদের শেখায় দু’আ মানে কেবল চাওয়া নয়, আত্মসমর্পণ। কখনো আমরা যা চাই, তা তাৎক্ষণিকভাবে পাই না। কিন্তু আল্লাহ আমাদের জন্য উত্তম কিছু সঞ্চিত রাখেন। কখনো তিনি বিপদ দূর করেন। কখনো আখিরাতে প্রতিদান রাখেন। দু’আ কখনোই বিফলে যায় না।
আজকের অস্থির সময়ে যখন সমাজে বিভাজন, হিংসা, অবিচার ও অনিশ্চয়তা বেড়ে চলেছে তখন রমজানের দু’আ হতে পারে পরিবর্তনের সূচনা। ব্যক্তি হিসেবে আমরা নিজেদের সংশোধনের জন্য দু’আ করি। পরিবারে শান্তির জন্য দু’আ করি। সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য দু’আ করি। একজন মুমিনের দু’আ কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয় সামষ্টিক কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা।
রমজান তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় আল্লাহ আমাদের খুব কাছে। রাতের নির্জনতায়, সেহরির নিস্তব্ধতায়, ইফতারের পূর্বমুহূর্তের আবেগঘন সময়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমরা দু’হাত তুলে যদি বলি, “হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ক্ষমা করো। আমাদের হিদায়াত দাও।” তবে সেই আবেদন আসমানের দরজায় ধাক্কা দেয় না; বরং সরাসরি আরশের মালিকের দরবারে পৌঁছে যায়।
আসুন, এ রমজানে আমরা দু’আর শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কার করি। শুধু ভাষায় নয়, অন্তরে পরিবর্তন আনি। শুধু চাওয়ার তালিকা নয়, তাওবা ও আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার করি।
কারণ সত্যিই এই রমজান হল দু’আ কবুলের সর্বোত্তম মাস। আর এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত হতে পারে আমাদের জীবনের নতুন সূচনা।