শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
বইমেলায় রুবিনা আলমগীরের “অপূর্ণতা” সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে স্টুডেন্টস কেয়ার জগন্নাথপুর এর প্রবাসী সংবর্ধনা ইফতার ও দোয়া মাহফিল সম্পন্ন জগন্নাথপুর হাসপাতালের তৃতীয়তলা থেকে পড়ে রোগীর মৃত্যু খুলনায় তৃষ্ণা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শুভ উদ্বোধন বৃহত্তর রাজশাহী সমিতি খুলনার দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত সিলেটের বিশ্বনাথে ডেফোডিল এসোসিয়েশনের খাদ্য সামগ্রী বিতরণ কবিতাঃ আমি ও একই জাত! আশেকে রাসুল আইনজীবী পরিষদের উদ্যোগে ঢাকার আইডিইবি ভবনে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত জগন্নাথপুর পৌর শহরে যানজটে জনভোগান্তি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা

বুক রিভিউ- আমার চোখে আন্না

Coder Boss
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬
  • ১৬ Time View

 

লেখক: মনিরুজ্জামান

‘আন্না কারেনিনা’ রাশিয়ান বিখ্যাত লেখক লিও তলস্তয়-এর জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস। ১৮৭৩ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত ধরাবাহিকভাবে ‘দি রাশিয়ান মেসেঞ্জার’-এ প্রকাশিত হয়। লেখাটি বই আকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭৮ সালে। বইটি প্রকাশ হওয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই নিষিদ্ধ করা হয়।

‘আন্না কারেনিনা’ বইটির নামকরণ করা হয় উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আন্নার নামানুসারে। আন্নার স্বামীর নাম আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন। স্বামীর পদবী কারেনিন আন্নার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উপন্যাসের নামকরণ করা হয় ‘আন্না কারেনিনা’। উপন্যাসটিতে তৎকালিন সমাজ বাস্তবতা এবং পারিবারিক জীবনের ব্যক্তিগত অবস্থার প্রকাশ পেয়েছে।

উনিশ শতক ছিল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার যুগ। এই সময় নিয়তিবাদের পরিবর্তে আসে যুক্তি-বিচারের মাধ্যমে বাস্তবতা বিশ্লেষণ। এই সময় জ¦রা জীর্ণতার খোলস ছেড়ে বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি উৎকর্ষতা লাভ করে। শিল্প-সাহিত্য কি আদৌ নিয়তিবাদের গন্ডি অতিক্রম করতে পেরেছে? সবকিছুই কি মানবিক হয়ে উঠেছে?

ভিক্টর হুগোর মতো মহান ব্যক্তি যেমন নিয়তিবাদের চক্র অতিক্রম করতে পারেননি তেমনি মহান ঋষি লিও তলস্তয়ও নিয়তিবাদের আদলেই লিখেছেন ‘আন্না কারেনিনা’।

‘লা মিজারেবল’ উপন্যাসে এক টুকরো রুটি চুরির অপরাধে জাঁ ভালজাঁকে জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছেন জেলখানায়। প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া যায়, উপন্যাসে কি জাঁ ভালজাঁর সততা এবং শ্রমকে অস্বীকার করা হয়েছে? কষ্ট তার নিয়তির লেখা ছিল বলেই হাজার চেষ্টা করেও তা এড়ানো যায়নি?

‘আন্না কারেনিনা’ দুই খন্ডের বারোশ পৃষ্ঠার উপন্যাসে প্রায় হাজার পৃষ্ঠা জুড়ে যার দৃপ্ত পদচারণা তাকে কেন রেললাইনে মাথা পেতে স্বেচ্ছায় মরতে হল? ভ্রনস্কির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের পরিণতি হিসেবে কি তলস্তয় এমন পরিণতি ঘটালেন? আন্না কারেনিনা কি তলস্তয়ের নীতিবোধের বলি হয়েছেন? একদিকে মা অপরদিকে প্রেমিকা এই দুই অবস্থার মানসিক দ্বন্দ্বের অর্ন্তজ¦ালা থেকে মুক্তির জন্যই আন্না আত্মহত্যা করেন।

আন্নার মধ্যে ভালোভাবে বেঁচে থাকার যথেষ্ট উপাদান ছিল। তিনি শুধু প্রেমপিয়াসী একজন অভিজাত রূপসী নারী ছিলেন না। তার অনেক গুণও দেখিয়েছেন তলস্তয়। কিন্তু সমাজ কি সেসব গুণের মূল্য দিতে পেরেছে? যদি যথার্থ মূল্য দেওয়া হতো তাহলে রেললাইনে মাথা দিয়ে আন্নাকে মরতে হতো না।

তলস্তয় দার্শনিক জাঁ জ্যাক রুশো এবং বিখ্যাত সাহিত্যিক জন চার্লস ডিকেন্স দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এ দুই মহান মনীষী দ্বারা প্রভাবিত হলেও তলস্তয় সাহিত্যে ভিন্ন কিছু পরিলক্ষিত হয়। ডিকেন্সের সাহিত্যে নিয়তির চেয়ে মানুষের শ্রমের মূল্য বড় করে দেখানো হয়েছে। মানবতাবাদী দার্শনিক রুশো দেখিয়েছেন মানবমুক্তির পথ। কিন্তু তলস্তয় সে সব পথ তার উপন্যাসে তৈরি করা চরিত্রে সহজ করে দেখাননি।

রাশিয়ায় বসে তলস্তয় যখন ‘আন্না কারেনিনা’ রচনা করছিলেন (১৮৭৫-৭৭) তখন বাংলা সাহিত্যে ‘ঋষি’ খেতাবপ্রাপ্ত সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা করেছিলেন ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৮৭৫)। সেখানেও নিয়তির খেলা দেখা যায়। গোবিন্দলালের পিস্তলের গুলিতে রোহিণীর মৃত্যু ঘটে। নিহত হওয়ার পূর্বমুহূর্তে রোহিণী বলেন, ‘কপালে যা লেখা ছিল, তাই হোলো।’ প্রবাদ বাক্য আওড়ানো যায়- আহা! “কপালের লিখিতং ঝাটা ইহা খন্ডাবে কোন বেটা।” রোহিণীর মৃত্যুর পরে গোবিন্দলাল ফিচেল খাঁর বানানো সাক্ষীর সহায়তায় হত্যামামলায় সম্পূর্ণ খালাস পেয়েছিল তবে বাংলা সাহিত্যের আদালতের কাঠগড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রকে বহুদিন দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, আজও সেই অভিযোগ থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে খালাস পান নি। গোবিন্দলালের গুন্ডামি শরৎচন্দ্রের মতো মহান লেখকই মেনে নিতে পারেননি আর সাধারণ পাঠক এটি মানবেন কি করে?

তলস্তয়ের শৈল্পিক ফসল আন্নাকে অতি যতœসহকারে গড়ে তুলেছেন। আনার ভাই স্তেপান অবলোনস্কি, স্বামী আলেক্সেই আলেকসান্দ্রভিচ কারেনিন, প্রেমিক আলেক্সেই ভ্রনস্কি এবং ভাইয়ের বন্ধু লেভিন। উপন্যাসের এই চারজন পুরুষের মাঝখানে আকাশছোঁয়া গম্বুজরূপী আন্না কারেনিনা। কিন্তু তার পরিণতি এমন ঘটিয়েছেন যা পড়লে পাঠক নিজের অজান্তেই দু’ফোটা অশ্রুজল বিসর্জন দেবেন।

‘পারিবারিক দুঃখগুলো যার যার তার তার, সুখের অনুভূতি সবারই সমান।’ এমন কথা দিয়েই উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন তলস্তয়। স্তেপান অবলোনস্কি আর ডলির দাম্পত্য জীবনে কলহের সৃষ্টি হয়। তাদের সন্তানের গৃহশিক্ষকের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন অবলোনস্কি। গোপন প্রেম সম্পর্কে ডলি জানতে পেরে বিবাহচ্ছ্যেদের সিদ্ধান নেন। পরকিয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তাদের পরিবারকে ঠিকিয়ে রাখতে সেন্ট পিটার্সবাগ থেকে মস্কো শহরে ছুটে আসেন আন্না।

আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের উচ্চবিত্ত শ্রেণির একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং ক্ষমতাধর সরকারি কর্মকর্তা। রাশিয়ার উচ্চবিত্ত সমাজে তাদের চলাফেরা। আন্নার সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্য প্রায় কুঁড়ি বছরের।

আন্না সুদূর ভবিষ্যতের কথা বলে ডলি আর অবলোনস্কির পরিবারকে সেবার বুঝিয়ে ঠিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু নিজের পরিবারের ধ্বংসের বীজ বপন করেছিলেন।

আন্না যখন মস্কো শহরে আসেন তখন এক বলনাচের অনুষ্ঠানে কাউন্ট ভ্রনস্কির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ভ্রনস্কি সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। পুঁজিবাদী সমাজ বিকাশের পক্ষে তিনি কাজ করেন। হাসপাতাল, স্কুল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। ভ্রনস্কি আগেই তার বন্ধু অবলোনস্কির নিকট আন্না সম্পর্কে জেনেছেন। প্রথম দেখাতেই ভ্রনস্কি আন্নার প্রেমে পড়ে যায়।

আন্না যখন স্বামীর গৃহে ফিরছিলেন তখন একই ট্রেনের যাত্রি হয়েছিলেন ভ্রনস্কি। রাতভর দু’জনের কথার পর ভ্রনস্কি তার প্রেমের কথা আন্নাকে জানালে আন্না এই প্রস্তাব মেনে নিতে পারেননি। আন্নার সন্তান সেরিওজাকে ছেড়ে ভ্রনস্কির সঙ্গে যাওয়া অসম্ভব।

কিন্তু মন থেকে ভ্রনস্কির প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন। সেন্ট পিটার্সবাগে স্বামীর গৃহে পৌঁছে ভ্রনস্কির কথাই বার বার মনে হচ্ছিল। তার জন্য আন্নার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ভ্রনস্কিকে দেখার পর আন্নার স্বামীর সামনে নিজেকে অপ্রস্তুত বলে মনে করতে থাকেন। ভ্রনস্কি যে সকল পার্টিতে

যেতে পারেন বলে আন্না মনে করেন তিনি সেই সকল পার্টিতে যেতে শুরু করেন। স্বামীর অগোছরে দেখা করতে থাকেন ভ্রনস্কির সঙ্গে।

ভ্রনস্কি আর আন্নার প্রেম নিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গের উচু মহলে গুঞ্জন শুরু হয়। আন্না ভ্রনস্কির প্রেমের কথা তার স্বামীর কাছে স্বীকার করলে আলেক্সেই আলেকসান্দ্রভিচ কারেনিন আন্নাকে ভ্রনস্কির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙ্গে দিতে বলেন কিন্তু আন্না তা অস্বীকার করেন।

ভ্রনস্কির কাছ থেকে আন্নাকে নিয়ে আসার শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন আলেক্সেই আলেকসান্দ্রভিচ কারেনিন। আন্না ভ্রনস্কিকে জানায় তার সন্তানের মা হতে যাচ্ছেন আন্না। এর কিছুদিন পরই আন্নার গর্ভে ভ্রনস্কির কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

একপর্যায়ে ভ্রনস্কি আন্নার নিকট ক্ষমা চেয়ে তাকে তালাক দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু আন্না তালাক নিতে অস্বীকার করেন। আন্নার এই কথা শুনে ভ্রনস্কি আত্মহত্যার চেষ্টা করেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এরপর আন্নাকে নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিলেন। রাশিয়া ছেড়ে ইতালিতে গিয়ে তারা বেশি দিন শান্তিতে বসবাস করতে পারেননি। আন্নার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ভ্রনস্কি আন্নার নিকট থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরতে থাকেন। তিক্ততায় জর্জরিত হয়ে আন্নার ওপর ভিরক্ত হয়ে যান ভ্রনস্কি।

সমাজতন্ত্রের সুন্দর একটি রূপ লেভিন। উপন্যাসের লেভিন চরত্রটি তলস্তয়ের ছায়া। লেভিন চরিত্রের মধ্যেই তলস্তয় নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেভিন জমিদার হওয়া সত্ত্বেও নিজে কৃষিকাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি শ্রমের প্রতি মর্যাদাশীল এবং শ্রমিকদের সঙ্গে নিজে গম কাটতেন।

কিটিকে ভালোবেসে প্রথমবার প্রত্যাখিত হলে বিয়ে করার আশা ছেড়ে দেন তিনি। পরবর্তীতে কিটির সঙ্গে আবার দেখা হলে তাদের বিয়ে হয়। কিটিকে নিয়ে লেভিন গ্রামে সুখে দিন অতিবাহিত করেন। তাদের ঘর আলোকিত করে পুত্র সন্তান এলা। একপর্যায়ে লেভিন নিজের জীবনের অর্থ খোঁজার অসীম তাগিদ অনুভব করেন। নিজের জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত ধর্মের বিরোধিতা করা এবং নিজের মধ্যে ঈশ^রের অস্তিত্ব অবিশ^াস করা এগুলোর মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বলে রাখা ভালো তলস্তয় নিজেই জীবনের অর্থ কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লিখেছেন “কনপেশন” নামক আত্মজীবনী।

লেভিন অশিক্ষিত এক কৃষকের কাছ থেকে উত্তর পেয়েছেন। তিনি বলেন, “এখন থেকে আমার জীবন, আমার পুরো জীবন, আমার যাই ঘটুক তার নির্বিশেষে, তার প্রতিটি মিনিট শুয়ে, আগের মতো অর্থহীন থাকবে না, তাতে থাকবে সুভের সন্দেহাতীত একটা বোধ, যা আমিই পারি সঞ্চারিত করতে।”

এবার আসি আন্নার কথায়। জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে অনেকেই নীরবে স্বেচ্ছায় মরণকে গ্রহণ করে থাকেন। আন্নাও তাই করেছেন। ভ্রনস্কির মা আন্নাকে ছেড়ে প্রিন্সেস সরোকিনাকে বিয়ে করতে বলেন। এই সংবাদে আন্নার মনে বাউল বাতাস বইতে থাকে। তিনি ভাবতে থাকেন ধনী সমাজের মহিলার সঙ্গে তার মায়ের বিয়ের পরিকল্পনাটি ভ্রনস্কি হয়তো মেনে নেবেন।

আন্নার সন্তান সেরিওজারকে দেখার জন্য মানসিক যন্ত্রণা অনূভব করতে থাকেন। একদিকে সন্তান আরেকদিকে প্রেমিক ভ্রনস্কি। এই দুই বিষয়ের দ্বন্দ্ব সর্বক্ষণ আন্নাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আশায় হঠাৎ একদিন চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন আন্না।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102