
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
ভাঙড়, দক্ষিণ ২৪ পরগণা
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
ইসলামি বর্ষপঞ্জির নবম মাস রমজান। এটি কেবল একটি সময়ের নাম নয়; এটি আত্মার পুনর্জন্মের ঋতু, ঈমানের নবায়নের সুযোগ এবং মানবিক চরিত্রকে শুদ্ধ করার এক মহামহিম প্রশিক্ষণশালা। এই মাসে আসমানের দরজা খুলে যায়। রহমত নাজিল হয় প্রবল স্রোতে। গুনাহ মাফের আহ্বান ধ্বনিত হয় প্রতিটি প্রহরে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।” (সুরা বাকারা ২:১৮৩)। এই আয়াত আমাদের জানিয়ে দেয়, রমজানের মূল লক্ষ্য ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করা নয়; বরং তাকওয়া অর্জন—অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও আত্মসংযমে পরিপূর্ণ এক জীবন গঠন।
রমজান মাস শৃঙ্খলার মাস। সুবহে সাদিকের পূর্বে সেহরির আহার গ্রহণ, নির্ধারিত সময়ে পানাহার ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা, সূর্যাস্তে ইফতারের মাধ্যমে রোজা ভাঙা— এসবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি বছরের অন্য সময়গুলোতে হয়তো অনিয়মে অভ্যস্ত, সেও রমজানে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। এখানে ঈমান ও ইহতিসাব—অর্থাৎ সওয়াবের প্রত্যাশা— এই দুই শর্ত আমাদের রোজাকে কেবল আচার নয়, সচেতন ইবাদতে রূপান্তরিত করে।
সংযম রমজানের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা যখন ক্ষুধার তীব্রতা অনুভব করি, তখন বুঝতে শিখি অভাবী মানুষের কষ্ট। পানির জন্য তৃষ্ণার্ত মুহূর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের অনাহার ও দুর্দশার কথা। এই অনুভূতি হৃদয়ে জন্ম দেয় সহমর্মিতা। তাই রমজান কেবল ব্যক্তিগত সাধনার মাস নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বোধ জাগ্রত করার সময়ও। কুরআনে বলা হয়েছে: “রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে মানবজাতির হেদায়াতস্বরূপ।” (সুরা বাকারা ২:১৮৫)। কুরআনের নাজিলের মাস হওয়ায় রমজান আমাদের কিতাবুল্লাহর সাথে সম্পর্ক নবায়নেরও আহ্বান জানায়। তিলাওয়াত, তাদাব্বুর ও আমলের মাধ্যমে কুরআনকে জীবনের বিধান হিসেবে গ্রহণ করাই এই মাসের প্রকৃত দাবি।
আত্মশুদ্ধি রমজানের আরেকটি প্রধান উদ্দেশ্য। মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অহংকার, হিংসা, লোভ, ক্রোধ— এসব নফসের রোগ রোজার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন: “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনও প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারি)। অর্থাৎ রোজা কেবল ক্ষুধা-পিপাসার নাম নয়; এটি চরিত্র সংশোধনের অঙ্গীকার। জিহ্বা সংযত রাখা, দৃষ্টি হেফাজত করা, কানকে গীবত ও অপবাদ থেকে রক্ষা করা— এসবই রোজার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এভাবে রমজান মানুষকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতার দিকে নিয়ে যায়।
এই মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। হাদিসে এসেছে, রমজানের প্রথম দশক রহমতের, মধ্য দশক মাগফিরাতের এবং শেষ দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তির। যদিও পুরো মাসই কল্যাণময়, তবু শেষ দশকে ইবাদতে অধিক মনোযোগ দেওয়ার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ দশকে কোমর বেঁধে ইবাদতে লিপ্ত হতেন, পরিবারকেও জাগ্রত করতেন। এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদর অর্থাৎ হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এক রজনী। কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে: “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সুরা কদর ৯৭:৩)। এই রাতের ইবাদত একটি দীর্ঘ জীবনের ইবাদতের সমতুল্য সওয়াব বয়ে আনে। তাই রমজানের শেষ দশক আমাদের জন্য অনন্য সুযোগ।
রমজান আমাদের দানশীলতা শিক্ষা দেয়। যাকাত ফরজ ইবাদত হিসেবে সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে। পাশাপাশি সদকাতুল ফিতর ও নফল দান গরিব-দুঃখীর মুখে হাসি ফোটায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। আর রমজানে তাঁর দানশীলতা বেগবান বাতাসের চেয়েও অধিক হতো। (সহিহ বুখারি)। ক্ষুধার অভিজ্ঞতা যখন আমাদের অন্তরে দয়া জাগায়, তখন দান হয়ে ওঠে আন্তরিকতার প্রকাশ। রমজান তাই সামাজিক বৈষম্য হ্রাসেরও এক কার্যকর মাধ্যম।
এই মাসে তারাবিহ নামাজের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির পেছনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ কিয়ামে কুরআন শ্রবণ করতেন। তারাবিহ কেবল নফল নামাজ নয়; এটি কুরআনের সাথে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ। একইসঙ্গে তাহাজ্জুদ, ইতিকাফ ও অধিক পরিমাণে দোয়া— এসব ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়। একটি হাদিসে আল্লাহ বলেন: “রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।” (সহিহ বুখারি)। এই ঘোষণা রোজার মর্যাদাকে বিশেষ উচ্চতায় আসীন করেছে। অন্য সব ইবাদতের সওয়াব নির্ধারিত হলেও রোজার সওয়াব আল্লাহ নিজ হাতে দান করবেন— এ এক অনন্য সম্মান।
রমজান ধৈর্যের মাস। রোজাকে হাদিসে বলা হয়েছে “সবরের অর্ধেক।” ক্ষুধা, পিপাসা, ক্লান্তি— এসব সহ্য করতে গিয়ে মানুষ ধৈর্যের অনুশীলন করে। এই ধৈর্য কেবল দিনের কয়েক ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং জীবনের প্রতিকূল মুহূর্তগুলোতেও প্রভাব ফেলে। যে ব্যক্তি রোজার মাধ্যমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে, সে অন্যায়, অবিচার ও প্রলোভনের মুখেও দৃঢ় থাকতে পারে। এভাবেই রমজান একজন মানুষকে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান করে তোলে।
রমজান কৃতজ্ঞতারও মাস। ইফতারের মুহূর্তে এক গ্লাস পানি বা একটি খেজুরের স্বাদ আমাদের উপলব্ধি করায় আল্লাহর অগণিত নেয়ামত। সাধারণ সময়ে যেসব অনুগ্রহকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি, রমজান সেগুলোকেই নতুন করে চিনতে শেখায়। কুরআনে বলা হয়েছে: “তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, কখনো তা গণনা করতে পারবে না।” (সুরা নাহল ১৬:১৮)। রোজা আমাদের এই নেয়ামতের মূল্য বুঝতে সাহায্য করে এবং কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত করে।
এই মাস পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করারও সময়। সেহরি ও ইফতারের টেবিলে পরিবার একত্রিত হয়। মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় সামাজিক ঐক্যকে মজবুত করে। ধনী-গরিব, উচ্চ-নিম্ন সকলেই একই কাতারে দাঁড়িয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। এ দৃশ্য মানবসমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রমজান আমাদের শেখায়, প্রকৃত মর্যাদা সম্পদে নয়; তাকওয়ায়। কুরআনে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাকি।” (সুরা হুজুরাত ৪৯:১৩)।
রমজান আত্মসমালোচনারও সময়। বছরের অন্য মাসগুলোতে আমরা কর্মব্যস্ততায় আত্মপর্যালোচনার সুযোগ পাই না। কিন্তু রমজান আমাদের থামতে শেখায়। নিজের আমলনামা পর্যালোচনা করতে শেখায়। অতীতের ভুল-ত্রুটি স্বীকার করে তওবা করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। আল্লাহ বলেন: “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।” (সুরা যুমার ৩৯:৫৩)। এই আশা ও প্রত্যাশাই রমজানের প্রাণ।
রমজান শেষ হয় ঈদুল ফিতরের আনন্দে। কিন্তু প্রকৃত সফলতা তারই, যার জীবন রমজানের পরও বদলে যায়। যদি আমাদের নামাজে মনোযোগ বাড়ে, গুনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা জোরদার হয়, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর হয় তবে বুঝতে হবে রমজান আমাদের হৃদয়ে দাগ কেটেছে। অন্যথায় রমজান কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে। আল্লাহর কাছে কামনা, তিনি যেন আমাদের রোজা, নামাজ, দোয়া ও দান কবুল করেন এবং রমজানের শিক্ষা সারা বছর ধারণ করার তাওফিক দান করেন।
রমজান সত্যিই শৃঙ্খলা, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। এটি মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। বান্দাকে রবের নৈকট্যে পৌঁছে দেয়। সমাজকে ন্যায় ও সহমর্মিতার পথে আহ্বান করে। ক্ষুধার মধ্য দিয়ে করুণা, সংযমের মধ্য দিয়ে চরিত্রগঠন, ইবাদতের মধ্য দিয়ে আত্মার পরিশুদ্ধি— এই তিনের সমন্বয়েই রমজানের পূর্ণতা। যে ব্যক্তি এই মাসকে যথাযথ মর্যাদায় গ্রহণ করে, তার জীবন আলোকিত হয় ঈমানের দীপ্তিতে। আর যে জাতি রমজানের শিক্ষা ধারণ করে, সে জাতি নৈতিক শক্তিতে অদম্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।