কলমে: শিরিনা আক্তার
মানব ইতিহাসে যুগে যুগে বহু মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে, কিন্তু তাঁদের মধ্যেও সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি কেবল একজন ধর্মপ্রচারক নন; তিনি ছিলেন মানবতার মুক্তিদূত, ন্যায় ও সত্যের পথপ্রদর্শক, দয়া, সহমর্মিতা ও সাম্যের মহান আদর্শ। তাঁর জীবন ও কর্ম মানবসভ্যতার জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা যুগে যুগে মানুষকে আলোকিত করেছে।
৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আরবের মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। পিতা আবদুল্লাহ ও মাতা আমিনার স্নেহ খুব অল্প বয়সেই হারিয়ে তিনি এতিম হিসেবে বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই তাঁর চরিত্র ছিল সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততায় উজ্জ্বল। সমাজের মানুষ তাঁকে “আল-আমিন” বা বিশ্বাসী নামে ডাকত। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সততা ও নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
তখনকার আরব সমাজ ছিল নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায় ও অমানবিকতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। শক্তিশালী দুর্বলকে অত্যাচার করত, নারীদের অধিকার ছিল না বললেই চলে, কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম প্রথাও প্রচলিত ছিল। এমন অন্ধকার সময়েই মহানবী (সা.) মানবতার মুক্তির বাণী নিয়ে আবির্ভূত হন। চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত লাভ করেন এবং মানবজাতিকে সত্য, ন্যায় ও একত্ববাদের পথে আহ্বান জানান।
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা ছিল শান্তি, ন্যায় ও মানবতার শিক্ষা। তিনি বলতেন—মানুষের মধ্যে যে উত্তম, সে-ই যে মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী। তাঁর জীবনাদর্শে ছিল ক্ষমাশীলতা ও সহনশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, অবমাননা করেছে, তাদের প্রতিও তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হননি; বরং ক্ষমা করে দিয়েছেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি ঘোষণা করেছিলেন—“আজ তোমাদের জন্য কোনো প্রতিশোধ নেই।” এই ক্ষমাশীলতা মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ।
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও মহানবী (সা.) ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞার অধিকারী। মদিনায় হিজরতের পর তিনি যে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, তা ছিল ন্যায়, সাম্য ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে গড়া। মদিনা সনদের মাধ্যমে তিনি মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা প্রদান করেন। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তাঁর রাষ্ট্রদর্শন ছিল সকল ধর্মের মানুষের জন্য ন্যায় ও সম্মানের ভিত্তিতে গঠিত।
নারী ও শিশুর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর ও আন্তরিক। তিনি নারীদের সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বলেছিলেন—“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করে।” কন্যাসন্তানকে তিনি আল্লাহর রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, যে ব্যক্তি কন্যাসন্তানকে স্নেহ ও যত্নে লালন-পালন করবে, তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। শিশুদের প্রতি তাঁর মমতা ছিল অসীম; তিনি শিশুদের স্নেহ করতেন, তাদের সঙ্গে খেলতেন এবং ভালোবাসা দিয়ে মানুষ হতে শেখাতেন।
মাতা-পিতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনকেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—“মায়ের পায়ের নিচেই সন্তানের জান্নাত।” আবার পিতার সম্মান ও মর্যাদার কথাও তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল—মানুষ যদি সত্যিকার অর্থে মানবিক হতে চায়, তবে তাকে পরিবার, সমাজ ও মানবতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
মহানবী (সা.) যুদ্ধ ও সহিংসতার বিরোধী ছিলেন। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশ ছিল—যুদ্ধে নিরীহ মানুষ, নারী, শিশু বা বৃদ্ধদের ওপর আঘাত করা যাবে না, গাছপালা ধ্বংস করা যাবে না, অন্যায়ভাবে কারও জীবন নেওয়া যাবে না। তাঁর এই শিক্ষা মানবতার প্রতি গভীর মমত্ববোধের পরিচয় বহন করে।
বিদায় হজের ভাষণে তিনি মানবতার সর্বজনীন বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেন—“সমস্ত মানুষ আদমের সন্তান; আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; একমাত্র তাকওয়া বা নৈতিকতাই মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি।” এই ঘোষণা বিশ্বমানবতার ইতিহাসে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দলিল।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সত্য, ন্যায়, দয়া ও মানবতার প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—মানুষের প্রতি ভালোবাসা, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও ন্যায়পরায়ণতা ছাড়া প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন এক মহৎ হৃদয়ের মানুষ, যিনি অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর পথ দেখিয়েছেন।
তাই যুগে যুগে মানুষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উচ্চারণ করে—
তিনি শুধু মুসলমানের নবী নন, তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করেই গড়ে উঠতে পারে ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতায় ভরা একটি সুন্দর পৃথিবী।