বিশেষ প্রতিনিধি
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ–কে নিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশকরে , তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ উচ্চ পরিচালনা পরিষদ। ব্যক্তিগত ঘটনার দায় কোনো ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানের নয় বলে জোর দাবী সুরেশ্বর দরবার কর্তৃপক্ষ
পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করে দরবার শরীফের নাম জড়িয়ে বিভিন্ন সংবাদ ও আলোচনা প্রচার করা হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে সমগ্র দেশবাসী, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিশেষ করে মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল ভক্ত-অনুরাগী, আশেক-মুরিদ, খলিফা ও শুভানুধ্যায়ীদের সদয় অবগতির জন্য এই বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ দেড় শত বছরেরও অধিক সময় ধরে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী, স্বনামধন্য ও পবিত্র ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠান ইসলামের আধ্যাত্মিক শিক্ষা, তাসাউফের চর্চা, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং এখান থেকে তারা নৈতিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করে থাকেন।
এ বিষয়ে দরবার শরীফের মোতাওয়াল্লী ও উচ্চ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হযরত সাইয়্যেদ শাহ্ সূফী কামাল নূরী আল সুরেশ্বরী বলেন,
“মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ একটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে দেড় শত বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। এখানে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামের শান্তি, মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা প্রচার করা হচ্ছে। তাই কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ঘটনার সঙ্গে দরবার শরীফের নাম জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত।” তিনি আরও বলেন,
“সুরেশ্বর দরবার শরীফ বলতে কোনো একজন ব্যক্তি বা কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবারকে বোঝানো হয় না। বরং এটি বহু পরিবার, অসংখ্য খলিফা, পীর-মুর্শীদ, দরবেশ এবং হাজার হাজার আশেক-মুরিদ ও ভক্তদের সম্মিলিত একটি আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান। তাই কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে এই মহান প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করা কখনোই ন্যায্য নয়।”
“সুরেশ্বর দরবার শরীফ দেড় শত বছরের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারক” — মহা পরিচালক
এ প্রসঙ্গে মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফের মহা পরিচালক ও গদিনশীন পীর ও মুর্শীদ ক্বিবলা হযরত সাইয়্যেদ শাহ্ সূফী বেলাল নূরী আল সুরেশ্বরী (মা.জি.আ.) বলেন,
“মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেড় শত বছরের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। এখানে যুগ যুগ ধরে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, তাসাউফের জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি এবং মানবকল্যাণের বার্তা মানুষের মাঝে প্রচার করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন,
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে থাকা অসংখ্য ভক্ত-আশেক এই দরবার শরীফের সঙ্গে আত্মিকভাবে সম্পৃক্ত। সুরেশ্বর দরবার শরীফ-এর আওলাদগণ ছাড়াও এই দরবারের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বহু খলিফা, পীর-মুর্শীদ, দরবেশ ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব নিজ নিজ গদিতে আসীন থেকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাসাউফের শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।” মহা পরিচালক আরও বলেন,
“কোনো একজন ব্যক্তি বিশেষ বা কোনো একটি পরিবারের কর্মকাণ্ডের দ্বারা সুরেশ্বর দরবার শরীফ-এর সামগ্রিক পরিচয় নির্ধারণ করা বা এই মহান প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করা কখনোই ন্যায্য নয়। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো দোষ, ত্রুটি, অনিয়ম বা অন্যায়ের দায় সম্পূর্ণরূপে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপর বর্তায়; সেই দায় কোনোভাবেই এই আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তায় না।” তিনি আরও বলেন,
“মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ সর্বদা রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান এবং বিচার বিভাগের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। এই প্রতিষ্ঠান কখনোই আইনবহির্ভূত, অন্যায় কিংবা সমাজবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না। বরং সমাজে ন্যায়, মানবিকতা, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ও আদর্শ।” গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন,
“যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী। এতে ভুল তথ্য ছড়ানো, গুজব সৃষ্টি এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।” দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।”
পরিচালনা পরিষদের আহ্বান
দরবার শরীফের উচ্চ পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে এই বার্তা প্রদান করেন শাহজাদা ডক্টর সাইয়্যেদ শাহ্ সূফী মুক্তাদির নূরী আল সুরেশ্বরী। তিনি বলেন, উপমহাদেশের ইসলাম প্রচারে সুফি-সাধকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত পীর-আউলিয়ারা প্রেম, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করে সাধারণ মানুষের মন জয় করেছিলেন এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক প্রভাবের ফলেই এখানে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে । সুফিগণ ভালোবাসা, মানবতা ও সেবার মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন । সুফি-দরবেশগণ স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে ইসলামের মর্মবাণী সহজভাবে প্রচার করতেন ।
সুফি-দরবেশগণ জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে বুকে টেনে নিয়ে তারা সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক নতুন সমাজ গঠন করেছিলেন । মূলত, সুফি-দরবেশদের খানকাহগুলো পরবর্তীতে ইসলামের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, যা আজো আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসেবে বিদ্যমান । তেমনি এক ঐতিহ্যবাহী মহান দরবার নিয়ে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশে আমরা বিস্মিত ও কিংকর্তব্য বিমুঢ়। প্রকৃত ঘটনার সাথে মুল দরবারের তেমন কোন সংশ্লিষ্ঠতা নাই বললেও চলে।
“দীর্ঘ ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক মর্যাদা এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ধারক এই মহান সুরেশ্বর দরবার শরীফ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে যথাযথ বিবেচনা, সংযম এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় প্রদান করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব।” শাহজাদা ডক্টর সাইয়্যেদ শাহ্ সূফী মুক্তাদির নূরী আল সুরেশ্বরী আরও বলেন, ইসলামের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— প্রত্যেক মানুষ তার নিজ নিজ কর্মের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার কাছে দায়বদ্ধ এবং প্রত্যেকেই তার নিজ কর্মফলের জন্য জবাবদিহি করবে। তাই কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ঘটনার সঙ্গে সুরেশ্বর দরবার শরীফ-এর নাম জড়িয়ে এই মহান প্রতিষ্ঠানকে মূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকার জন্য সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানানো হচ্ছে।”