
শাহ সুফি সাঈদ আনওয়ার মোবারকী আল ক্বাদেরী
আজ নাজাতের দশকের ২য় দিন। গতকাল বুধবার ২১ রমজান ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন । এ দিনে ইসলামের ৪র্থ খলিফা মাওলায়ে কায়েনাত, তরিকত,মারাফাত,হাকিকত, এহলে তাসাউফ এর সম্রাট, হায়দারে কাররার, মাওলা আলী, মুশকিল কুশা, শেরে খোদা, পাঞ্জাতনে পাক এর অন্যতম সদস্য,আলী ইবনে আবু তালিব (ইমাম হাসান ও হোসাইন এর পিতা ও মা ফাতেমা (সাঃ আঃ) এর স্বামী এবং রাসুল(সাঃ) এর আপন চাচাতো ভাই এবং প্রথম মুসলিম) হজরত আলি (রা.) পবিত্র শাহাদাত বার্ষিকী পালিত হয়েছে। আবার এ দিনেই খেলাফত লাভ করেন তারই পুত্র হজরত হাসান (রা.)।
পবিত্র শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ ফাতিহা খানি ও দোয়া এবং ইফতারি মেহফিল “খানকাহ ফকির জহুর আল কাদরী ঢাকার বকশি বাজার খানকাহ শরিফে (১নং বকশি বাজার রোড) অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিশেষ ফাতিহা খানি ও দোয়া এবং ইফতারি মেহফিলে দোয়া ও মুনাজাত পরিচালনা করেন, বকশি বাজার দরবার শরীফের বর্তমান গদীনশীন পীর, বিশিষ্ট সমাজসেবক, সুফি স্কলার, শীর্ষ ব্যবসায়ী, দানবীর, ফকীর শাহ্ সাঈদ আনওয়ার আল মোবারকী ক্বাদরী,চিশতি পীর কেবলা।
মেহফিলে সকল স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং খানকাহ শরীফের সকল মুরীদান,অসংখ্য আশেকে রাসূল, বরেণ্য ভিসি, নজরুল গবেষক শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ঠ ব্যাবসায়ী, সরকারের উচ্ছপদস্থ’ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ওলামা মাশায়েক ও ভক্তরা অংশ গ্রহন করেন ।
ইতিহাসে এ দিনের স্মরণীয় ঘটনা
রমজানের ২১ তারিখ হজরত মুসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে আসমানে তুলে নেন। ২১ রমজান অনেক নবি-রাসুল জন্ম ও মৃত্যু হয়।
২১ রমজান মুসলিম উম্মাহর কাছে যেমনি এক হৃদয় বিদারক ঘটনা আবার অন্য দিকে ইসলামের অনন্য আনন্দের দিন। কারণ এ দিনে হজরত হাসান (রা.) খেলাফত লাভ করেছিলেন।
হজরত হাসান ইবনে আলি (রা.) তার বাবা হজরত আলির (রা.) গুণাবলী বর্ণনাসহ ওঠে এসেছে ২১ রমজানের আরো কিছু তথ্য।
তিনি বলেন, ‘তিনি (হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু) এমন এক রাতে শাহাদাত বরণ করছেন-
> যে রাতে কুরআনুল কারিম নাজিল হয়েছে।
> হজরত ঈসাকে (আ.) আসমানে তুলে নেয়া হয়েছে এবং
> হজরত মুসা (আ.)ও ২১ রমজান মারা যান।
ইসলামের ইতিহাসে ৪০ হিজরির ২১ রমজান এক ঐতিহাসিক দিন। এ দিনেই বালকদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হজরত আলি (রা.) এক আততায়ী (ইবনে মুলযান)-এর তরবারির আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
আজ ২১ রমজান, ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হজরত আলী (রা.)–এর শাহাদত দিবস। এ উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা তার জীবন, ত্যাগ ও ন্যায়বিচারের আদর্শকে স্মরণ করছেন।
এই সপ্তাহে ইরাকের নাজাফ শহরে অবস্থিত হজরত আলী (আ.)–এর মাজারে লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল নেমেছে। বিশেষ করে রমজানের ২১ তারিখ ঘিরে এই শহরে মুসল্লিদের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
ইতিহাস অনুযায়ী, কুফা মসজিদে ফজরের নামাজ আদায়ের সময় বিষমাখা তরবারি দিয়ে হজরত আলী (রা.)–এর ওপর হামলা চালায় ঘাতক আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম। ১৯ রমজানের সেই হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং দুই দিন পর ২১ রমজানে শাহাদত বরণ করেন।
হজরত আলী (রা.)–এর শাহাদত দিবস উপলক্ষে ইরান, ইরাক, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শোকসভা, মজলিস ও শোক মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। সোমবার (১৯ রমজান) থেকে শুরু হওয়া এসব কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক মুসলমান অংশ নিচ্ছেন।
মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী, হজরত আলী (রা.)–এর জন্মও ছিল এক অলৌকিক ঘটনা। তার জন্ম হয়েছিল ইসলামের পবিত্রতম স্থান কাবা শরিফের ভেতরে। ফলে তার জন্মস্থান ও শাহাদতস্থল—দুই স্থানই আজ মুসলমানদের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে আছে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও তার স্মরণ নতুন তাৎপর্য পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরান ও লেবাননকে ঘিরে সংঘাত এবং গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ মুসলিম বিশ্বে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইতিহাসে হজরত আলী (রা.) পাঁচ বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন, যা ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে তার শাহাদাতের মাধ্যমে শেষ হয়। এই সময় তিনি ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং মানবিক নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। একজন যোদ্ধা, প্রশাসক, বিচারক ও জ্ঞানী আলেম হিসেবে তার বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ইসলামী ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে।
জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার প্রসারে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার বিখ্যাত উক্তি—‘আমাকে জিজ্ঞেস করো, আমাকে জিজ্ঞেস করো, আমি তোমাদের মাঝে না থাকার আগে’—ইসলামী জ্ঞানচর্চায় তার আত্মবিশ্বাস ও প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে।
তার জীবন ও চিন্তাধারা সংকলিত হয়েছে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নাহজুল বালাগা’–তে, যেখানে তার খুতবা, চিঠি ও বাণী স্থান পেয়েছে। এই গ্রন্থটি আরবি থেকে ফারসি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মানসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বহু গবেষক ও ইতিহাসবিদ তার চিন্তাধারা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।
ইসলামী ইতিহাসে হজরত আলী (রা.) বিভিন্ন সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘আসাদুল্লাহ’ (আল্লাহর সিংহ), ‘হায়দার’, ‘বাবুল মদিনাতুল ইলম’ (জ্ঞাননগরীর দরজা) এবং ‘ফাতেহে খায়বার’।
শুধু মুসলমানই নয়, বহু অমুসলিম চিন্তাবিদও তার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছেন। লেবাননের খ্রিস্টান গবেষক জর্জ জুরদাক তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য ভয়েস অব হিউম্যান জাস্টিস–এ হজরত আলী (রা.)–এর ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক চরিত্রের উচ্চ প্রশংসা করেছেন।
হজরত আলী (রা.)–এর শাসনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো মিসরের গভর্নর হিসেবে নিয়োগের সময় তার সাহাবি মালিক আল-আশতারকে লেখা চিঠি। সেখানে তিনি শাসকদের জনগণের প্রতি ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও কল্যাণমূলক আচরণ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
হজরত আলী (রা.) তার সেই চিঠিতে লিখেছিলেন, শাসক ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সদিচ্ছা তৈরি হয় ন্যায়বিচার, দয়া ও সেবার মাধ্যমে। জনগণের কল্যাণে কাজ করলে তারা শাসকের ওপর আস্থা রাখবে, আর অবিচার করলে সেই আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে।
ইসলামের ইতিহাসে হজরত আলী (রা.)–এর জীবন ও আদর্শ আজও নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তার শাহাদত দিবস মুসলিম বিশ্বকে সেই আদর্শের কথাই আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়।
মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র রমজানের দিনগুলোয় অনেক বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে রত থাকতে এবং আল্লাহপাকের হক এবং বান্দার হক প্রদানের ক্ষেত্রেও যেন সচেষ্ট হতে পারি, সেই তৌফিক দান করুন, আমিন।
লেখক: বিশিষ্ট সুফি স্কলার, গবেষক, সাজ্জাদানীশিন বকশী বাজার খানকাহ শরিফ।