
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
রমজান মাস মুসলমানের জীবনে রহমত মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাস মানুষকে নতুন করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ দেয়। রোজা মানুষের শরীরকে সংযম শেখায়। মনকে করে পবিত্র। এই পবিত্র মাসেই রয়েছে এক বিশেষ ইবাদত। সেই ইবাদতের নাম ইতেকাফ।
ইতেকাফ মানে হল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদে অবস্থান করা। দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে কিছু সময় দূরে থাকা। নিজের হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণে ভরিয়ে তোলা। মানুষের জীবন আজ খুব ব্যস্ত। চারদিকে কাজের চাপ। নানা চিন্তা। নানা আকর্ষণ। এই সবের ভিড়ে মানুষ অনেক সময় নিজের আত্মাকে ভুলে যায়। ইতেকাফ সেই ভুলে যাওয়া আত্মাকে আবার জাগিয়ে তোলে।
কুরআনে ইতেকাফের কথা উল্লেখ আছে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা যখন মসজিদে ইতেকাফে থাকবে তখন স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না।” এই নির্দেশ মানুষকে সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়। মানুষের মন যেন সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। এটাই ইতেকাফের মূল শিক্ষা।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করতেন। হাদিসে এসেছে। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন।” মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই আমল অব্যাহত রেখেছেন। পরে তাঁর স্ত্রীগণও এই আমল চালু রাখেন। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় ইতেকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ইবাদত।
রমজানের শেষ দশ দিন খুব মূল্যবান সময়। এই সময়েই রয়েছে মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল ক্বদর। কুরআনে বলা হয়েছে। লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। অর্থাৎ এই রাতের ইবাদত দীর্ঘ সময়ের ইবাদতের চেয়েও মূল্যবান। ইতেকাফ মানুষের জন্য সেই মহিমান্বিত রাতের সন্ধান সহজ করে দেয়। কারণ ইতেকাফে থাকা ব্যক্তি মসজিদে অবস্থান করেন। তাঁর দিন রাত কাটে নামাজ কুরআন তেলাওয়াত জিকির ও দোয়ায়।
ইতেকাফ মানুষের হৃদয়কে নরম করে। অহংকার দূর করে। মানুষ বুঝতে পারে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আসল জীবন আখিরাতের জীবন। এই উপলব্ধি মানুষের চরিত্রকে বদলে দেয়। মানুষ অন্যায় থেকে দূরে থাকতে শেখে। মানুষের প্রতি মমতা বাড়ে। আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা হৃদয়ে গভীর হয়।
হাদিসে ইতেকাফের অনেক ফজিলতের কথা এসেছে। একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতেকাফ করে আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝে বহু দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন।” এই বাণী মানুষকে ইতেকাফের প্রতি উৎসাহিত করে। কারণ এই ইবাদত মানুষের আখিরাতকে নিরাপদ করে।
ইতেকাফ শুধু মসজিদে বসে থাকা নয়। এটি আত্মশুদ্ধির এক প্রশিক্ষণ। এই সময় মানুষ নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চায়। আল্লাহর কাছে দোয়া করে। কুরআন পড়ে। নিজের জীবনের হিসাব করে। অনেক মানুষ এই সময়ে চোখের পানি ফেলে তওবা করে। এই কান্না মানুষের হৃদয়কে পবিত্র করে।
আজকের সমাজে মানুষের মনে অস্থিরতা বেড়েছে। মানুষের হৃদয়ে শান্তি কমে গেছে। অনেকেই সুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত শান্তি আসে আল্লাহর স্মরণে। কুরআনে বলা হয়েছে,”আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়ের শান্তি।” ইতেকাফ সেই শান্তির দরজা খুলে দেয়। মসজিদের নীরব পরিবেশে মানুষ আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়।
ইতেকাফ সমাজের জন্যও একটি শিক্ষা। এটি মানুষকে সরল জীবন শেখায়। মানুষ বুঝতে পারে অল্পতেই জীবন চলে। অনেক চাওয়া পাওয়া আসলে অপ্রয়োজনীয়। যখন মানুষ এই উপলব্ধি নিয়ে ঘরে ফিরে আসে তখন তার আচরণ বদলে যায়। সে পরিবারে শান্তি আনে। সমাজে কল্যাণ ছড়ায়।
রমজানের শেষ দশ দিন তাই আমাদের জন্য বড় সুযোগ। এই সময় আমরা যদি কিছুদিন মসজিদে ইতেকাফ করতে পারি তবে তা হবে বড় সৌভাগ্যের বিষয়। যারা পুরো দশ দিন পারবে না তারা কিছু সময় মসজিদে কাটাতে পারে। বেশি বেশি নামাজ পড়তে পারে। কুরআন পড়তে পারে। দোয়া করতে পারে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে।
ইতেকাফ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা এই পৃথিবীর স্থায়ী বাসিন্দা নই। আমরা সবাই একদিন আল্লাহর কাছে ফিরে যাব। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে পবিত্র করা দরকার। আল্লাহর স্মরণে জীবনকে সাজানো দরকার। ইতেকাফ সেই পথের এক সুন্দর আহ্বান।
রমজানের এই বরকতময় দিনে আসুন আমরা সবাই আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটি। মসজিদের নীরব পরিবেশে কিছু সময় কাটাই। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। তাঁর রহমত কামনা করি। এই নীরব সাধনাই আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করবে। আমাদের জীবনকে সুন্দর করবে। আখিরাতকে সফল করবে।