মোঃ আছাদুল হক, স্টাফ রিপোর্টার
পরনে এখনও লাল বিয়ের শাড়ি। হাতে টকটকে লাল মেহেদির দাগ। যে শাড়িতে হয়েছিল জীবনের নতুন শুরু, সেই শাড়িতেই নিথর হয়ে পড়ে আছে নববধূ মিতু আক্তারের দেহ। চারদিকে স্বজনদের আহাজারি, কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চত্বর। সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই নিভে গেছে ১৩টি প্রাণ।
শুক্রবার ১৩ মার্চ সকাল ১০টায় জানাজার নামাজ শেষে দাফন করা হয়েছে নববধূ মিতু আক্তার, তার ছোট বোন লামিয়া, দাদি রাশিদা ও নানিকে। শেষ বিদায়ের সময় স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যায় খুলনার কয়রা উপজেলার মেয়ে মিতু আক্তারের সঙ্গে বাগেরহাটের মোংলার যুবক সাব্বিরের বিয়ে হয়। সারাদিনজুড়ে ছিল বিয়ের আয়োজন, আত্মীয়স্বজনের ভিড়, হাসি-আনন্দ আর নতুন সংসারের স্বপ্নে ভরা পরিবেশ। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বরপক্ষের সদস্যরা রাতটিও কাটান কনের বাড়িতেই। কেউ ভাবেনি আনন্দের সেই রাতের পরই অপেক্ষা করছে এমন নির্মম পরিণতি।
বৃহস্পতিবার সকালে বিয়ের সাজেই নতুন জীবনের পথে রওনা দেন মিতু। একটি মাইক্রোবাসে করে তিনি যাচ্ছিলেন বরের বাড়ি। একই গাড়িতে ছিলেন তার ছোট বোন লামিয়া, দাদি রাশিদা এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য।
কিন্তু নিয়তি যেন ওত পেতে ছিল পথেই। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মাইক্রোবাসে বর পরিবারের ১১ জন, কনে পরিবারের ৩ জন এবং চালকসহ মোট ১৫ জন ছিলেন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় বর পরিবারের ৯ জন, কনে পরিবারের ৩ জন এবং চালকসহ মোট ১৩ জন নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বর সাব্বির, নববধূ মিতু আক্তার, তার বোন লামিয়া, দাদি রাশিদা ও নানি আনোয়ারাসহ আরও অনেকে।
দুর্ঘটনার পর বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে একের পর এক মরদেহ আনা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নবদম্পতিসহ নিহতদের মরদেহ দেখে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতাল চত্বর।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে পড়ে কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়ন। স্থানীয়রা জানান, সকালে যে মেয়েটি বিয়ের সাজে বিদায় নিয়েছিল, বিকেলের মধ্যেই তার মৃত্যুর খবর শুনে কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও বিয়ের সানাই বাজছিল, সেই বাড়িতেই এখন শুধু কান্নার শব্দ। মুহূর্তেই আনন্দ ভেঙে বিষাদের সাগরে ডুবে গেছে দুটি পরিবার। পুরো গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।