এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী
রাজনীতি যখন জনকল্যাণের আদর্শ ছেড়ে মাদকের কালো টাকার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন তা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পচন ধরায়। এর ফলে যে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর মধ্যে তরুণদের আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে পেশিশক্তি ও মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত করা হচেছ। এতে মেধাবী ও সুস্থ ধারার নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথ বন্ধ হয়ে যাচেছ। মাদক ও রাজনীতি যখন হাত মেলায়, তখন এলাকাভিত্তিক গ্যাং কালচার ও সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মাদক কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচেছ।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক মাদক সম্রাট তাদের পুরনো ‘ছাতা’ বদলে নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ের সন্ধান করে, যাতে তাদের ব্যবসা ও প্রভাব অব্যাহত থাকে।
তরুণ প্রজন্ম, যারা দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি, তারা নেশার ঘোরে পথভ্রষ্ট হচেছ। এতে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। মাদক ও দুর্নীতির এই কলুষিত পরিবেশ দেখে সৎ ও যোগ্য তরুণরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচেছ, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
অনেক মাদক কারবারী রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে। তারা মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় থেকে দলের বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করে এবং বিনিময়ে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় থাকা মাদক কারবারীদেরও অনেক সময় বড় বড় রাজনৈতিক দলের ইফতার মাহফিল বা জনসভার মঞ্চে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। এটি সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করে।
মাদকের মাধ্যমে উপার্জিত বিপুল সম্পদ তারা রাজনীতিতে বিনিয়োগ করে এবং বিভিন্ন সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মোটা অঙ্কের অনুদান দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে।
মাদকের ব্যাপক বিস্তার শুরু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দেওয়ার পর থেকই।
মিয়ানমারের আরাকান তথা রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণ এখন কেবল একটি সামরিক বিজয় নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ‘মাদক অর্থনীতি’র উত্থান। জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার মেটাতে আরাকান আর্মি বাংলাদেশকে তাদের মাদকের প্রধান ‘ডাম্পিং স্টেশন’ ও ‘ক্যাশ মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের যুবসমাজ কেবল ধ্বংস হচেছ না, বরং বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির জীবনীশক্তি ‘ডলার’ পাচার হয়ে আরাকান আর্মির রণভান্ডারে যুক্ত হচেছ। এটি এখন আর কেবল সীমান্ত অপরাধ নয়, বরং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক যুদ্ধ। জানা যাচেছ আরাকান আর্মি চতুরতার সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ড্রাগ কার্টেল বা সিন্ডিকেটগুলোর সঙ্গে গোপন ‘পেমেন্ট মেকানিজম’ গড়ে তুলছে।
মাদক বিক্রির লব্ধ টাকা (বিডিটি) বাংলাদেশে স্থানীয় হুন্ডি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। পরে তা অবৈধ বাজার থেকে ডলারে রূপান্তর করে মিয়ানমার বা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচার করা হচেছ। এদের প্রতিরোধ করা না গেলে বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে এই মাদক চোরাচালান ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে কাজ করবে। বিপুল ক্যাপিটাল আউটফ্লো বা পুঁজি পাচার বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে চরম রক্তক্ষরণ ঘটাবে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রক্ত পানি করা অর্থ ড্রাগ লর্ডদের হাত ঘুরে ডলারে রূপান্তরিত হয়ে আরাকান আর্মির অত্যাধুনিক গোলবারুদ, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও ড্রোন কেনার প্রধান অর্থায়নে পরিণত হয়েছে। আরাকান আর্মি সরাসরি মাদক উৎপাদন না করলেও একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মিয়ানমারের শান রাজ্য বা গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল থেকে আসা ইয়াবা ও আইস যখন আরাকান হয়ে বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হয়, তখন আরাকান আর্মি সেই চালানের নিরাপত্তার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের ‘সুরক্ষা কর’ আদায় করে। দেশে মাদকের গডফাদার ৮৫ আর কারবারি প্রায় ১২ হাজার।
আন্তর্জাতিক চক্র একসময় বাংলাদেশকে মাদকের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করতো। মাদকের এই আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রকে দেশের যারা সহযোগিতা করতো এখন তারাই গডফাদার হয়ে অবৈধ মাদক ছড়িয়ে দিচেছ সর্বত্র। অবৈধ মাদকই একমাত্র দ্রব্য যা উদ্ধার এবং সরবরাহকারিকে গ্রেফতারে একযোগে কাজ করছে দেশের সবগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সীমান্ত এলাকায় মাদক অনুপ্রবেশে কাজ করছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এছাড়া শুধু অবৈধ মাদক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান। যার নাম ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’। কিন্তু সবার প্রচেষ্টার পরও মাদকের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে না সমাজকে।
অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিশেষ করে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেরাই মাদক সরবরাহে জড়িত। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে অভিযানের আগেই তাদের কাছে তথ্য ফাঁস এমনকি নিজেরাও কৌশলে মাদক সরবরাহে সহযোগিতা করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য বিভিন্ন সময়ে মাদক নিয়ে ধরা পড়েছেন।
এছাড়া রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও অবৈধ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। নায়িকা-মডেলসহ উঁচু তলার অনেকেই ফাইভ স্টার হোটেলে অবস্থান করে মাদক সরবরাহে দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। যে কারনে মাদকের অবৈধ বিস্তার কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না।
মাদক নির্মূলই যাদের কাজ সেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তাকেই মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বরাবরই সরকারের কাছে দাবি করে আসছেন, তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যে কারনে তারা মাদক নির্মূল করতে পারছেন না। কিন্তু‘ এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা মাদক নির্মূলের চেয়ে মাদকাসক্ত নিরাময়ের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। মাদক নিরাময়ের জন্য প্রতিবছর মোটা অঙ্কের টাকা বাজেট করতে হচেছ সরকারকে। এ বছরেও মাদক নিরাময়ে মোটা অঙ্কের টাকার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, মাদক নিয়ন্ত্রণ কিংবা সহজলভ্য না হলে কারো মাদকাসক্ত হবার সুযোগ নেই। মাদকাসক্ত নিরাময়ের চেয়ে মাদক নির্মূল বেশি জরুরী। এছাড়া এর চিকিৎসাও ব্যয়বহুল।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। মাদকের গডফাদারদের গ্রেফতারে রয়েছে তাদের এক ধরনের অনীহা। চাকরি টিকিয়ে রাখতে মাঝে মধ্যে গাঁজা ও কিছু ইয়াবা উদ্ধার করে তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করে।
ইয়াবার চালান ঠেকাতে সরকারি নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও ঠেকানো যাচেছ না এই মাদকের বিস্তার। এখন ইয়াবার পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো ভয়ঙ্কর মাদকও আসছে বাংলাদেশে। আশির দশকে ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা ফেনসিডিলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছিল মাদকসেবীদের কাছে। এরপর কিছু সময় হেরোইনে আসক্ত হয় মাদকসেবীরা। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা। মাদকসেবীদের প্রথম পছন্দই এখন ইয়াবা। মিয়ানমার এবং বাংলাদেশি সংঘবদ্ধ মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উপায়ে ইয়াবার চালান মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে এবং এখান থেকে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশে সেগুলো পাচার করা হচেছ।
সচেতন নাগরিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রায়ই উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, যখন একজন মাদক কারবারী নেতার মর্যাদা পায়, তখন তা সমাজের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করে।
যদিও সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদক নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং কঠোর হুঁশিয়ারি উ”চারণ করে থাকে, তবুও মাঠপর্যায়ে মাদক কারবারীদের এই রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে
এই চক্র থেকে বের হতে হলে রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক:
সিনিয়র সহসভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম, মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি, চেয়ারম্যান, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ, কক্সবাজার।