এডভোকেট মোঃ বাবুল হাওলাদার
সড়ক দুর্ঘটনা ঘটার পর, বিশেষ করে হতাহতের সংখ্যা বেশী হলে দুর্ঘটনা স্থলে মন্ত্রী, সেখানকার ডিসি, এসপি, ছোট কর্তা, বড় কর্তা, তাদের প্রটোকল এবং প্রভৃতি রকমের আনুষ্ঠানিকতায় উদ্ধার অভিযানসহ সেখানকার যাবতীয় স্বাভাবিক কাজকর্মে উল্টো মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি, লোক সম্মুখে কড়া নির্দেশনা, একাধিক তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা ইত্যাদী যেন জাতির ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। অথচ আগে থেকেই এসমস্ত দুর্ঘটনা কিভাবে এড়ানো যায়, সে ব্যাপারে কর্তাব্যক্তিগণ বা কর্তৃপক্ষ বরাবরই নির্বিকার, উদাসীন!
সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচিত একটি বিষয়। বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষ । পঙ্গুত্ব বরণ করেন প্রায় ৮০ হাজার। রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয় ২১ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪০ হাজার কোটি টাক। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলোও আমাদের সামনে পরিস্কার। বেসরকারীভাবে হলেও এবিষয়ে গবেষণা, সুপারিশমালা তৈরী হয়েছে নেহায়েত কম নয়। বলা হয়ে থাকে, সড়ক দুর্ঘটনা নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ইতোপূর্বেকার গবেষণা এবং সুপারিশমালা অনুসরণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে নিয়ন্ত্রণের কাজে শতভাগ সফলতা অর্জন করা যায় বলেই বোধ করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য , সবকিছুই যেন বক্তৃতা, বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আইন আছে, নীতিমালা আছে, কার্যকারীতা নেই। যারা কার্যকর করবেন, এ যেন শর্ষের মধ্যে ভূত!
এবারের ঈদের আগে দেখা গেছে, ২০/২৫ বছরের পূরনো ফেলে রাখা সম্পূর্ণ আনফিট গাড়ীগুলো ঘষামাজা করে, জোড়াতালি দিয়ে, রংচঙ করে সড়কে নামিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতির ফুল ঝুড়িও শোনা গেছে। কিন্তু প্রকাশ্যে একাজ গুলো সম্পন্ন হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, এমন ঘটনা আমাদের নজরে আসেনি। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ২৬৮ টি, নিহতের খবর পাওয়া গেছে ২৫০ এর কাছাকাছি, আহতের সংখ্যা কমপক্ষে ৬০০। গাড়ী বা সম্পদের ক্ষতি সবসময় বিনেহিসেবেই থেকে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, তাদের সারাজীবনের ক্ষতি, মানসিক অবস্থা, আহতদের চিকিৎসা। এর সার্বিক নির্ণয়ন অনেক বেশী ভয়াবহ। যার বা যাদের পরিবারে এমনটি ঘটেছে তারা বা তাদের আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, প্রতক্ষদর্শী ব্যতীত এটা অনুমান করাও অসম্ভব। সর্বোপরি পুরো চাপটা এসে পড়ে সমাজে, রাষ্ট্রে, শারীরিক, মানসিক চিকিৎসা ক্ষেত্রে, জাতীয় অর্থনীতিতে। সর্বশেষ দৌলতদিয়ার ফেরীতে ঘটে যাওয়া বাস দুর্ঘটনাটি সমগ্র জাতিকে হতবাক করেছে। কেউ কেউ বলছেন, ফেরীটিতে রেলিং না থাকা দুর্ঘটনাটির প্রধান কারণ। দুর্ঘটনাগুলোর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অতিরিক্ত গতি, চালকদের মধ্যে পাল্লা দেওয়ার প্রবণতা, বিশ্রামহীনতা, নেশাগ্রস্ততা, ওভারটেকিং, মহাসড়কগুলোতে ওয়ানওয়ে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারা, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, অপ্রশিক্ষিত চালক/ হেলপার দ্বারা গাড়ী চালানো, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা না করা, অধিক মুনাফা লাভের আশায় ফিটনেসবিহীন, লক্কর ঝক্কর গাড়ী সড়কে নামানো প্রভৃতি। প্রকৃতপক্ষে একক কোনো সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের পক্ষে জাতীয় এ সমস্যাটির সমাধান অসম্ভব। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, মালিক, চালক, হেলপার, যাত্রী, স্থানীয় সকল পর্যায়ের প্রশাসনের সচেতনতা, দায়িত্ববোধই পারে মহামারী আকার ধারণ করা এ জাতীয় সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে।