
নিজস্ব প্রতিবেদক:
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কাচিনা জয়দেব এলাকার বাসিন্দা সালমা এক হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার হয়ে ন্যায়বিচারের আকুতি জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শাশুড়ীর ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুলিশি পক্ষপাতের কারণে তাকে ও তার আত্মীয়স্বজনদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২৮ জুন ২০২৪ তারিখে, যখন তার স্বামী ভুঞাপুর পৌরসভার লোকমান ফকির মহিলা কলেজের সামনে এক গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২৩ জুলাই প্রথমবার রিলিজ এবং পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৩ আগস্ট পুনরায় ভর্তি করা হয়। ৮ আগস্ট তিনি মোটামুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
এই দীর্ঘ চিকিৎসা ব্যয়ের ভার বহন করতে গিয়ে সালমা তার বাবার বাড়ির ওয়ারিশি সম্পত্তি বিক্রি করেন। কিন্তু তার এই ত্যাগের বিনিময়ে তিনি পান নির্মম প্রতিদান।
পরবর্তীতে স্বামী ও শাশুড়ীর পক্ষ থেকে আরও অর্থের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং তার মা ও ভাইয়ের সম্পত্তি বিক্রির জন্য জোরাজুরি করা হয়। এতে রাজি না হওয়ায় ২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে তাকে তালাক দেওয়া হয় এবং ১০ জানুয়ারি তিনি তালাকের নোটিশ পান।
এরপর সালমা নিজের অধিকার আদায়ের জন্য আইনের আশ্রয় নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ১৬ এপ্রিল ২০২৫ পারিবারিক অধিকার আদায়ের মামলা এবং ২০ এপ্রিল যৌতুক নিরোধক আইন ও নাবালক শিশু উদ্ধার সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়।
এদিকে, শাশুড়ী বাদী হয়ে ছেলের বৌ ও তার আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন, যার ঘটনার তারিখ উল্লেখ করা হয় ১৩ এপ্রিল ২০২৪—যা সম্পূর্ণভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ, কারণ ওই সময় স্বামী চিকিৎসাধীন ছিলেন। মামলায় ১৪৭, ৩০৭, ৩২৫, ৪৪৭, ৩৭৯ ও ১০৯ ধারায় গুরুতর অভিযোগ আনা হয়।
সালমার অভিযোগ, মামলাটি সম্পূর্ণ বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সম্পদ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য সাজানো। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—পুলিশ তদন্তে এই অসঙ্গতিগুলো থাকা সত্ত্বেও পক্ষপাতমূলক প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
বর্তমানে সালমা জামিনে থাকলেও অন্য আসামিরা পলাতক এবং তিনি প্রতিনিয়ত পুলিশি চাপ, সামাজিক অপমান ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভুঞাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী এ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে মামলা প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। সালমার দাবি, রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন:
২৮-০৬-২০২৪: স্বামীর গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনা ও হাসপাতালে ভর্তি
২৩-০৭-২০২৪: প্রথমবার হাসপাতাল থেকে রিলিজ
০৩-০৮-২০২৪: পুনরায় অসুস্থ হয়ে ভর্তি
০৮-০৮-২০২৪: পুনরায় রিলিজ
০২-০১-২০২৫: তালাক প্রদান
১০-০১-২০২৫: তালাকের নোটিশ প্রাপ্তি
১৬-০৪-২০২৫: পারিবারিক মামলা দায়ের
২০-০৪-২০২৫: যৌতুক ও শিশু উদ্ধার মামলা দায়ের
১৩-০৪-২০২৪ (বিতর্কিত): মিথ্যা মামলার উল্লেখিত ঘটনা তারিখ
সালমার আবেগঘন বক্তব্য:
“স্বামীর জীবন বাঁচাতে আমি আমার শেষ সম্বল পর্যন্ত বিক্রি করেছি।
আজ সেই আমাকেই মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে সমাজে অপমান করা হচ্ছে।
শাশুড়ীর ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে আমাদের জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
আমি প্রশাসন ও সাংবাদিক ভাইদের কাছে অনুরোধ করছি—
আমাকে বাঁচান, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করুন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন।”
শেষ কথা:
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি আমাদের সমাজে আইনের অপব্যবহার, নারীর ত্যাগ এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এখন দেখার বিষয়—সত্যের জয় হয়, নাকি প্রভাবশালী মহলের চাপে ন্যায়বিচার আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।