লেখক: পলাশ মন্ডল আকাশ
আমাদের দেশে এক অদ্ভুত বৈষম্যের আখ্যান চলছে। যে রাষ্ট্রটি টিকে আছে সাধারণ কৃষক আর প্রবাসী শ্রমিকের ঘামে, সেই রাষ্ট্রের সব সুখ-সুবিধা ভোগ করছে একদল 'উচ্চশিক্ষিত' সুবিধাভোগী শ্রেণী। ক্ষমতার পালাবদল হয়, সরকার আসে-যায়, কিন্তু এই শিক্ষিত সিন্ডিকেটের ভাগ্য কোনোদিন বদলায় না।
মায়াবী বেতন ও অলৌকিক অট্টালিকা:
যুক্তি দিয়ে ভাবুন—একজন সরকারি বা বেসরকারি কর্মকর্তার সারা জীবনের বৈধ বেতন আর বোনাস দিয়ে ঢাকা শহরে একাধিক পাঁচতলা বাড়ি আর বিদেশে (কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই) 'সেকেন্ড হোম' গড়া কি আদোও সম্ভব? কিন্তু আমাদের এই 'মেধাবী' জাদুকরদের হাতে এমন এক মায়াবী কলম আছে, যার এক খোঁচায় অসম্ভব সব সম্ভব হয়ে যায়। 'প্রজেক্ট কস্টিং' আর 'ফাইল ম্যানেজমেন্ট'-এর আড়ালে তারা প্রতিনিয়ত দেশের রক্ত চুষছে।
রাজকীয় সুবিধা বনাম হাড়ভাঙা খাটুনি:
১. শিক্ষিতদের বিলাসিতা: দেশের ট্যাক্সের টাকায় এই শিক্ষিত শ্রেণী পায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গাড়ির সুবিধা, সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষা আর বিদেশের সুচিকিৎসা। এমনকি অবসরে যাওয়ার পরও তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে কাঁড়ি কাঁড়ি সুযোগ-সুবিধা।
২. অবহেলিত প্রাণশক্তি: অন্যদিকে, যে প্রবাসী শ্রমিক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের রিজার্ভ বাঁচিয়ে রাখে, তার জন্য এয়ারপোর্টে সামান্য সম্মানটুকুও নেই। যে কৃষক রোদে পুড়ে ফসল ফলায়, তার সন্তানদের জন্য কোনো ভালো স্কুল বা চিকিৎসার সুব্যবস্থা রাষ্ট্র আজও নিশ্চিত করতে পারেনি।
কবিতার ছন্দে তিতা সত্য:
"বেতনের টাকায় তো হয় না রে ভাই সাত মহলা ঘর,
জনগণের রক্ত চুষে করছ আপন মানুষ পর!
শ্রমিকের ঘামে বাজেট বাড়ে, বিলাসিতা করো তোমরা,
ডিগ্রি তোমায় অফিসার বানাল, কিন্তু হলো না মনটা সফুরা!"
বিবেকের আয়নায় শেষ কথা:
শিক্ষা যদি কেবল নিজের আখের গোছানোর আর অন্যের রক্ত চোষার 'আধুনিক লাইসেন্স' হয়, তবে সেই ডিগ্রির চেয়ে অক্ষরজ্ঞানহীন শ্রমিকের সততা অনেক বেশি মহৎ। দেশটা আজও টিকে আছে সেই সাধারণ মানুষের কাঁধে ভর করে, যাদের বড় ডিগ্রি নেই কিন্তু বড় একটা মন আছে। এই শিক্ষিত সমাজ যদি নিজেদের বিবেককে দেশপ্রেমের আয়নায় না দেখে, তবে আমাদের এই উন্নয়নের গল্পগুলো একদিন ইতিহাসের পাতায় কেবল ঘৃণিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সার্টিফিকেট দিয়ে হয়তো চেয়ার পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের দোয়া আর দেশের মুক্তি পেতে হলে আগে 'মানুষ' হওয়া প্রয়োজন।