মোহাম্মদ মনজুর আলম অনিক
সাধু ভাষায় রচিত, উপন্যাস, পর্ব -১
মোমিন চলিতে লাগিল গন্তব্যহীন পন্থ ধরিয়া কোথায় যাইয়া ঠাঁই লইবে তাহা তাহার জানা নাই,, কাহার কাছে যাইয়া একটুখানি আশ্রয় লইবে তাহাও জানা নাই।দূর শহরে হয়তো অনেক বন্ধু রহিয়াছে তাহাদের ঠিকানা ও তাহার জানা নাই। শহরে বড় বড় পদে বন্ধুরা চাকরি করিতেছে তাহা তাহার জানা। কিন্তু শহরের কোন প্রান্তে কোন ঠিকানায় বন্ধুরা থাকে তাহা সে জানে না। তবু সে চলিতে লাগিল,তাহাকে যে যাইতেই হইবে তাহা না হইলে সে কেমন করিয়া সংসারের জ্বালা যন্ত্রণা হইতে পরিত্রাণ পাইবে?
এখন রাত্রি প্রায় পৌনে বারোটা হাঁটিতে হাঁটিতে পীরগঞ্জ রেল স্টেশনে আসিয়া পৌছিল, ট্রেন প্রায় আধা ঘণ্টা আগেই ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে খুলনার উদ্দেশ্যে।অগত্যা রাত্রি টা এইখানেই যাপন করিতে হইবে। কিন্তু কোথায় শুইবে? শুইবার ন্যায় জায়গা পাইতেছে না,মোমিন গরীব হইলেও, ভাঙা গৃহে বসবাস করিলে ও ভাঙা চোরা গৃহে চৌকি রহিয়াছে, চৌকিতে কাঁথার উপর কাঁথা বিছাইয়া সামান্যতম নরম করিয়া তাহার উপর শয়।যত্রতত্র শুইবার অভ্যাস তাহার নাই।
মোমিন দেখিল তাহার মত অনেকেই ট্টেন না পাইয়া প্ল্যাটফর্মে গুটি শুটি হইয়া শুইয়া পড়িয়াছে। এমনিতেই তাহারা অঘোরে নিদ্রা যাইতেছে। মুমিনের শরীর প্ল্যাটফর্মে শুইবার তাকিদ অনুভব করিল না হৃদয় মন কোনমতেই সায় দিল না। মোমিন ভাবিল এমনিতেই দাঁড়াইয়া বসিয়া কোনরকমে রাত্রিটা কাটাইয়া দিবে। কিন্তু সে বাড়ি হইতে প্রায় ৪০ /৪৫ কিলোমিটার হাটিয়া পীরগঞ্জ রেলস্টেশনে আসিয়া পৌঁছিয়াছে, শরীরটাও নিদ্রা চাহিতেছে। কোনরকমে একটু ঘুমাইতে পারিলেই হয় কিন্তু নিদ্রা যাইবার পরিবেশ বা জায়গা তাহার কোথায়?রেল স্টেশনের চতুর দিকের নোংরা পরিবেশ দেখিয়া তাহার নয়নে জল আসিয়া পরিল।দেখিল অনেক ফকির মিসকিন সারাদিন ভিক্ষা করিয়া রাত্রিবেলা প্ল্যাটফর্মে আসিয়া নিজেকে বস্তার মধ্যে আবদ্ধ করিয়া প্ল্যাটফর্মে পড়িয়া রহিয়াছে।
দেখিল অনেক ভিখারিনী নিজের ছেড়া অঁচল পাতিয়া উহাতে গুটি সুটি হইয়া ঘুমাইতেছে। কি ভীষণ রকম নোংরা হয়তো সারাদিন গোসল পাতি হয়তো করে নাই। মুখের উপর অনেক মশা ভন ভন করিতেছে কিছু কিছু মশা রক্ত চুষিয়া খাইতেছে।মোমিন তাহা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিতেছে। হায়রে মানুষের জীবন! সে তো ভুগিতেছে যন্ত্রণায়, হয়তো তাহার চাইতেও বেশি যন্ত্রণায় ভুগিতেছে ইহারা।
প্ল্যাটফর্মের মাঝে মাঝে খুটিগুলো ঘেশিয়া উঁচু করিয়া ইট দ্বারা বাধা রহিয়াছে, সান বাঁধার মত করিয়া। ইহাতে শয়ন করা যায় কিন্তু আগেই লোকজনেরা উহা দখল করিয়া ঘুমাইতেছে। অগত্যা মোমিন প্ল্যাটফর্মের এদিক হইতে ওদিক পায়চারি করিবার মত করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলো। রেল স্টেশনের দোকানপাট গুলো এখনো খোলা রহিয়াছে লোকজনেরা উহাতে প্রয়োজনমতো পান সিগারেট লইয়া মনের সুখে চিবাইতেছে সিগারেটে টান মারিতেছে। কেহ কেহ সাহেব বাবুর মত নতুন নতুন শার্ট প্যান্ট পরিয়া সিগারেট টানিতেছে। হয়তো তাহারাও দূর গন্তব্যে যাইবে। হয়তো তাহারাও মোমিনের মত ট্রেন ফেল করিয়াছে। সাথে দামি দামি বাক্স পেট্রা পরিলক্ষিত হইতেছে। হয়তো তাহারা দূরের শহরে কোন বড় কোন চাকরি করিতেছে।দুই একজন লোক সিগারেটের ফুক মারিতে মাটিতে মোমিনের দিকে আর চোখে তাকাইতেছে, মোমিনের পরিধানে শার্ট প্যান্ট নাই সাধারণ লুঙ্গি পরিয়া গায়ে জামা জরাইয়া চরণে সাধারন রকম পাদুকা পরিয়া আসিয়াছে। মস্তকের অলক রাশি বেহায়া ধরনের আলু থালু হইয়া পরিয়াছে।তাহার বক্ষে ভীষণ রকমের কোকড়ানো কুচকানো সাংসারিক ব্যথা যন্ত্রণা। পোশাকের প্রতি যত্নবান হইবার কাল তাহার কোথায়?
সারাদিন তাহার গায়ে যে সমস্ত পোশাক ছিল সেইসব পড়িয়াই নিরুদ্দেশে বাহির হইয়া পড়িয়াছে। সাদা শার্টের উপর লম্বা স্ট্রীপ ধরনের টান টান করিয়া প্রিন্ট করিয়া রহিয়াছে। সাদা অংশ গুলোতে সারাদিনের ময়লা ধুলা জমিয়া শার্টটা কে কেমন বীভৎস মনে হইতেছে। পরনের লুঙ্গি খানিও কেমন বিশ্রী রকম হইয়া পড়িয়াছে তার উপর সারাদিন গোসল বাতি করে নাই। সেই দিক দিয়াও সে নিজেকে প্ল্যাটফর্মের উপর পরিয়া থাকা ফকির মিসকিনদের হইতে নিজেকে আলাদা করিতে পারিল না। তাহাকে তাহার নিজের নিকট রাস্তার ফকির মিসকিন বলিয়ায় মনে হইল।
প্ল্যাটফর্মে হাটিতে হাঁটিতে এইসব ভাবিতে ভাবিতে একটা খুঁটির সহিত হেলান দিয়ে বসিয়া পড়িল। মোমিন সাধারণত বিড়ি সিগারেট খায়না, কিন্তু বাড়ি হইতে বাহির হইয়া রেল স্টেশনে আসিবার সময় কাতিহার আসিয়া যখন রাত্রি আটটা কিংবা নয়টা বাজিয়াছিল তখন একটা দোকান হইতে ইচ্ছা করিয়াই ৫ টাকার সুরুজ বিড়ি কিনিয়া লইয়াছিল, জামার পকেট হইতে একটা বিড়ি বাহির করিয়া মুখের সামনে আনিয়া জ্বালাইতে চাহিলো, কিন্তু দিয়াশলাই তাহার নিকটে নাই, কেমন করিয়া বিড়ি জালাইবে, অগত্যা আবার উঠিয়া পাশের একটা দোকানে যাইতে হইল।
মোমিন দোকানি কে শুধাইল
-একটা শালায় দেন তো ভাই?
- কি করবেন কিনবেন নাকি শুধু বিড়ি জ্বালাবেন?
- না ভাই এই একটু বিড়িটা জ্বালিয়ে নেব আর কি।
দোকানদার দিয়াশলাই মোমিনকে আগাইয়া দিল। মুমিন একটা কাঠি বাহির করিয়া বিডি জ্বালাইলো। পুনরায় আসিয়া খুটির সহিত হেলান দিয়া বিড়ি টানিতে লাগিল। এইবার সে বাড়ির কথা মনে করিয়া দর দর করিয়া নয়ন বহাইতে লাগিল। মনে মনে বলিতে লাগিল হায়রে ঘর! হায়রে সংসার! হায়রে স্ত্রী! নিজের স্ত্রী কেমন করিয়া স্বামীর বক্ষে আঘাত করিতে পারে? কথার চাবুক মারিয়া নিরন্তর নির্যাতন করিতে পারে? মোমিন রেলস্টেশনের উত্তর দিকে শেষের খুটির সাথে হেলান দিয়া বসিয়াছে, তাই তাহার চোখের জল দেখিতেছে না।সে এমন করিয়া বসিয়াছে যাহাতে সচরাচর মানুষের চোক্ষে না পড়ে। মোমিন একটা খুব সাধারন ঘরের ছেলে, পরের গৃহে কামলা খাটিয়া পিতার সহিত গরিবের সংসার পরিচালনা করিয়াছে। রৌদ্রে পুরিয়া বৃষ্টিতে ভিজিয়া অর্থ উপার্জন করিবার অভ্যাস তাহার ছোটকাল হইতেই। ফাঁকে ফাঁকে স্কুলে যাইয়া স্কুল পাস করিয়া, মেট্রিক করিয়াছে, তাহাও আবার ফার্স্ট ডিভিশনে। মোমিন যখন মেট্রিক পরীক্ষা দিল পরীক্ষার দ্বিতীয় দিন তাহার ঘরে কোন খাবার ছিল না, গোটা কতক চাউল কুঠির তলায় পরিয়াছিল,তাহাই তাহার জন্মদাত্রী মাতা খোলাতে করিয়া ভাজিয়া দিয়াছিল। মোমিন তাহাই বক্ষে ক্রন্দন চাপিয়া চিবাইয়া খাইয়া পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল, সাবজেক্টটা ছিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র। মোমিনের পিতা পরের বাড়িতে কামলা খাটিতে গিয়েছিল। পরীক্ষার সময় নিজ নিজ ছেলে মেয়েদের সাথে তাদের পিতা মাতারা পরীক্ষার কেন্দ্রে যায়, কিন্তু মোমিনের সাথে যাইবার মতো কেউ ছিল না, মোমিনের একটা বড় চাচা আছে বটে বিশাল বড় ধনী লোক। মোমিনদের খোঁজখবর তেমন একটা নেয় না। চলবে....