বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবীর নবাব আলিবর্দী খান

Coder Boss
  • Update Time : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩ Time View

 

নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা

বঙ্গবীর নবাব আলিবর্দী খান (১৬৭৬-১৭৫৬) বাংলা, বিহার ও ওড়িষ্যার নওয়াব। তিনি প্রথম জীবনে মির্জা মুহম্মদ আলী নামে পরিচিত ছিলেন। সুজাউদ্দীনের শ্বশুর মুর্শিদকুলী জাফর খানের মৃত্যুর পর মির্জা মুহম্মদ আলী সুজাউদ্দীনকে বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করেন। মুর্শিদকুলীর পুত্রসন্তান না থাকায় সুজাউদ্দীনই ছিলেন বাংলার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী। কিন্তু জামাতা এবং শ্বশুরের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল না। ১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলীর মৃত্যুর পর সুজাউদ্দীন মির্জা মুহম্মদ আলীর চেষ্টায় বাংলার মসনদে আরোহণে সমর্থ হন। পরামর্শ এবং অকৃত্রিম সেবার জন্য সুজাউদ্দীন মির্জা মুহম্মদ আলীর পরিবারকে নানাভাবে পুরস্কৃত করেন। তিনি ১৭২৮ সালে মির্জা মুহম্মদ আলীকে ‘আলীবর্দী’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
বন্ধুরা নবাব আলিবর্দী খান ছিলেন নির্ভীক, ধর্মপরায়ণ ও নিরহংকার। নিজেকে আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দা মনে করতেন। তিনি ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একবারের বেশি দুবার তিনি কোনো কাজের নির্দেশ দিতেন না, এবং সেটাই প্রতিপালিত হত।
তার নওয়াবি আমল ভালো থাকায় জিনিসপত্রের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে ছিল এবং প্রজাগণ মোটের উপর বলা যায় সুখে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করত। এ কথা সব ঐতিহাসিকই স্বীকার করেন, নবাব আলিবর্দী খান ছিলেন একজন মহৎ হৃদয়ের ব্যক্তি। দুর্বল চারিত্রিক দোষ ও নিষ্ঠুরতা তার মধ্যে বিন্দুমাত্র ছিল না।
আলিবর্দী খানের বিনোদন ছিল তার পরিবার-পরিজন নিয়ে গঠিত অন্দর মহল আর প্রিয়জনদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা। নবাব আলিবর্দী খুব অল্পতেই খুশি থেকে পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার কাছে নামাজ ও কোরআন পাঠ করে শুকরিয়া আদায় করতেন।
আরাম-আয়েশ, কোঠা-বাঈজী, মদ-নেশা এগুলো অসুন্দর জিনিষ থেকে তিনি হর হামেশা দূরেই থাকতেন। তিনি যৌবনকাল হইতে পবিত্র সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সফল শাসক এবং নির্ভীক যোদ্ধা। তিনি ছিলেন ধর্মভীরু এবং চরিত্রবান, যা তৎকালীন নবাব -বাদশাহগণের মধ্যে বিরল ছিল।
নবাব আলিবর্দীর দৈনন্দিন কর্মসূচি থেকে তাঁর সুনিয়ন্ত্রিত জীবনের আভাস পাওয়া যায়। তিনি নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করতেন। আলিবর্দীর প্রকৃত নাম মীর্জা মোহাম্মদ আলি। আলিবর্দী খান মুঘল সম্রাট কর্তৃক সুবা বাংলার স্বাধীনতার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। আলিবর্দী খান সাহসী যোদ্ধা ও কূটনীতিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
বিচক্ষণ ও শক্তিমান নবাব আলিবর্দি খান তাঁর অন্যতম দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বিশেষ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। সিরাজ সূতিকাগার থেকে নির্গত হলেই মাতামহের অনাবিল স্নেহের পরশ লাভ করেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে নিজের সান্নিধ্যে রেখেছিলেন। নবাব আলিবর্দী খান কিশোর বয়সের সিরাজের বুদ্ধিমত্তা ও শৌর্যবীর্যের প্রতি যথেষ্ট দুর্বল ছিলেন। আলিবর্দী তাঁর নিজের নামানুসারে তারই ভালবাসার মানুষৃসিরাজের নাম রাখেন মীর্জা মোহাম্মদ।
গোলাম হোসেন তাবাতাবাই লিখেছেন যে, “ নবাব আলিবর্দী খান শান্তিপ্রিয় ও প্রজাবৎসল নবাব ছিলেন। প্রজাদের শান্তি ও কল্যাণ নবাব আলিবর্দীর কাম্য ছিল এবং তার নবাবি আমলে প্রজারা এরূপ সুখ শান্তিতে ছিল যে, যেন তারা পিতা বা মাতার কোলেশায়িত আছে। জমিদাররা যাতে প্রজাদের উপর উৎপীড়ন না করতে পারে সেদিকে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল”।
নবাব আলিবর্দী খান পশুপাখি ভালবাসতেন। তাই ইউরোপীয়ানরা কেউ তাকে ভালো আরবী ঘোড়া উপহার দিয়েছেন, কেউ কাবলী বিড়াল,কাট বিড়ালী, খরগোস,ময়ূর, টিয়া, ময়না পাখি, বুলবুলি পাখি, কাকাতুয়া আনিয়ে দিচ্ছেন, কেউবা আফ্রিকা থেকে একজোড়া নতুন রকমের হরিণ আনিয়ে রাজধানীতে পাঠাচ্ছেন। নবাব নাকি খোলাখুলিই সকলকে উপদেশ দিতেন, টুপিওয়ালাদের দল ঠিক মৌমাছির মতো। আস্তে আস্তে চাপ দিলে তাদের কাছ থেকে খানিকটা মধু সংগ্রহ করা যায় বটে, কিন্তু খবরদার কেউ যেন তাদের চাকে হাত দিতে না যায়, তা হলেই ওরা হুল ফুটিয়ে দেবে।
নবাব সকল ধর্ম বর্ণ গোত্রের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তাইতো তাঁর নবাবি আমলে সকল ধর্মীয় উৎসব পালন হতো হৃদয়ের বন্ধনে।
আলীবর্দী খান অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার মৃত্যু আসন্ন ভেবে তিনি তার দৌহিত্র ও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী সিরাজউদ্দৌলাকে কাছে ডেকে দেশ শাসন সম্পর্কিত মূল্যবান উপদেশ দেন। তিনি ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। বঙ্গবীর নবাব আলিবর্দী খানের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছিলো সারা বংলা জুড়ে।
নিদারুন গ্রীষ্মের মধ্যেও নবাব মহল থেকে খোশবাগ পর্যন্ত অগণিত জনতা রাস্তার দুপাশে ভিড় করে থাকে,চার পাশের বাড়ি থেকে নবাবের শবাধারের ওপর ফুলের বৃষ্টি হলো। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেলো রাস্তার রাঙা মাটি। ছায়া শীতল খোশবাগে যখন নবাবের মৃত দেহ এসে পৌছালো তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে নিরবে ঢলে পড়ছিল। আর ঘন বৃক্ষের অসংখ্য শাখা প্রশাখার আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়ে যায় শোকের ছায়ায় চুপি চুপি।
“১০ এপ্রিল বাংলার বীর দেশপ্রেমী নবাব আলিবর্দী খানের মৃত্যু বার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি“।
লেখক :- নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম রক্তধারা প্রজন্ম; সম্পাদক- সাপ্তাহিক পলাশী।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102