
এম.কে জাকির হোসাইন বিপ্লবী
বর্তমান অসুস্থতার মোকাবেলা করছে বেগম জিয়া।নেতাকর্মীদের ভাষ্যমতে নেই কোন তার চিকিৎসা, যে চিকিৎসা করলে সে সুস্থ হতে পারবে। দলের ঊর্ধ্বতন নেতাকর্মীদের আলোচনাকে বিশ্লেষণ করলে কষ্ট বোঝা যায়, মৃত্যুর সন্নিকটে দাঁড়িয়ে আছে বেগম জিয়া। যেকোনো সময় বাংলাদেশ শুনতে পাবে, বেগম জিয়া আর নেই।ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাবে বাংলার রাজনীতির স্বপ্ন।কারণ এ দেশের রাজনীতি ইতিহাসে বেগম জিয়া একটি আবেগের নাম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়জন নেতা-নেত্রী রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করেছেন, খালেদা জিয়া তাদের মধ্যে অন্যতম এবং নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আলোচিত নারী-নেত্রী। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর একটি বিশাল রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়—যা কেবল দল পরিচালনার নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত বিস্তৃত।বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দুরদর্ষিক তার কারণে, এদেশের জনগণ ওনার প্রতি মুগ্ধ। কথাবার্তায় রয়েছে মাধুর্যতা, অত্যন্ত সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে উনি ওনার রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন। যার কারণে এদেশের জনগণ আজও জানতে চায়নি, বেগম জিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা কি? বেগম জিয়ার শিক্ষাগতা যোগ্যতা নিয়ে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেটি হলো মাধ্যমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে ১৯৬০ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। পরে আর পড়ালেখা করেননি ওনি।বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, এবং অত্যন্ত গভীর জ্ঞানের অধিকারী বেগম জিয়া। তার জ্ঞান, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারনে, কখনো জাতির মনে প্রশ্ন তুলেনি তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে। রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান আপোষহীন। দীর্ঘ কারাবাস, জাতীয় আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নারী হিসেবে পুরুষ-শাসিত রাজনৈতিক পরিসরে অদম্য অবস্থান—তাঁকে ‘ইতিহাসের আপোষহীন নারী বিপ্লব’-এর প্রতীক হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
শৈশব, পারিবারিক পটভূমি ও ব্যক্তিজীবনের ভিত্তি
খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অগ্রসর এবং মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবার। তরুণ বয়সে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের পূর্বে তাঁর রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড বা সংগঠনিক পরিচয় শক্তিশালী ছিল না; কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংকট তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর এবং ১৯৭৬–১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খালেদা জিয়া ছিলেন মূলত গৃহবধূ; কিন্তু ১৯৮১ সালে স্বামীর হত্যাকাণ্ড তাঁকে রাজনৈতিক আদর্শ, নেতৃত্ব এবং সংগঠন পরিচালনার পথে ঠেলে দেয়।
রাজনীতিতে প্রবেশ: প্রেক্ষাপট, চাপ ও নেতৃত্বের শুরু
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যখন নেতৃত্বহীন অবস্থায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই দলের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সকল পক্ষের দৃষ্টি পড়েছিল খালেদা জিয়ার ওপর। ১৯৮৩–৮৪ সালে আন্দোলন, দমন-পীড়ন, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ—এসব বাস্তব পরিস্থিতি তাঁকে “রাজনৈতিক দায়িত্ব” নিতে বাধ্য করে। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
রাজনীতিতে পদার্পণের পর থেকেই শুরু হয় তাঁর ‘আপোষহীন’ রাজনৈতিক চরিত্রের উত্থান—যা পরবর্তী তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন (১৯৮৩–১৯৯০)
এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি রাজপথের প্রতিরোধ, অবরোধ, সভা-সমাবেশ এবং আন্দোলন সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় স্তরে পরিচিত নেতা হয়ে ওঠেন।
এই সময়ে তিনি—
বহুবার গৃহবন্দী হন
দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন সামলান
বিরোধী দলগুলোর ঐক্য জোরদার করেন
গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিতের সংগ্রামে দৃঢ় থাকেন
১৯৯০ সালে সামরিক শাসন পতনের পর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।
প্রথম প্রধানমন্ত্রী (১৯৯১–১৯৯৬): গণতন্ত্রের পুনর্গঠন
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া হন প্রথম নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রথম মেয়াদ ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ
সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন (১৯৯১) রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করা—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো পাল্টে দেয়।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার
বেসরকারিকরণ
বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহ
শিল্পায়ন
সামাজিক ও শিক্ষায় পরিবর্তন প্রাথমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি, মেয়েদের শিক্ষার প্রসার, মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি খাতে উন্নতি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী পুনর্বাসনে সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।
তবে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬) বর্জন ও রাজনৈতিক ভুল-ত্রুটির কারণে তাঁর সরকারকে সমালোচিত হতে হয়।
দ্বিতীয় মেয়াদ (২০০১–২০০৬): উন্নয়ন, প্রভাব ও বিতর্ক
২০০১ সালে আবার বিজয়ী হয়ে তিনি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। এই সময় অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য কাজ হয়।
উন্নয়নমূলক উদ্যোগ
জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ে
অবকাঠামো উন্নয়ন (সড়ক, ব্রিজ, বিদ্যুৎ)
প্রবাসী কল্যাণ উন্নয়ন
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিস্তার
নারীশিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
প্রধান সমালোচনা
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জঙ্গিবাদ সমস্যা, বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাত, সহিংসতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা—এসব বিষয় তাঁর সরকারের বিতর্কে যুক্ত হয়।
সংগ্রাম, কারাবাস ও আপোষহীনতা (২০০৭–২০২১)
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে নানা মামলা করা হয় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০১৮ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় আবারও কারাবন্দী হন। তাঁর স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও অবনতি ঘটতে থাকে। এই সময়েও তিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন—যদিও কারাবাস ও স্বাস্থ্যগত কারণে সক্রিয় রাজনীতি কমাতে হয়।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন—রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বিচারিক হয়রানি—এগুলোই ছিল তাঁর জীবনযুদ্ধের কঠিন অধ্যায়।
নারী নেতৃত্ব ও সামাজিক প্রভাব
খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশ নয়, মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন।
নারী নেতৃত্বকে মূলধারায় আনা!
প্রশাসন ও মন্ত্রিসভায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি!
প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের বিস্তার!
এগুলো তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি বড় অংশ।
সমালোচনামূলক মূল্যায়ন: ‘আপোষহীন নারী বিপ্লব’—কতটা ঐতিহাসিক সত্য?
“আপোষহীন নারী বিপ্লব” একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক। তবে তার বিশ্লেষণ প্রয়োজন—
যা তাঁকে ‘আপোষহীন’ বানিয়েছে
স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
দীর্ঘ কারাবাস ও দমন সত্ত্বেও অবস্থান না বদলানো
দলীয় নেতৃত্বে কড়াকড়ি ও স্থিরতা
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ধারাবাহিক আন্দোলন
যা তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাকে বিতর্কিত করেছে
কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
দলীয় ক্ষমতার রাজনীতি।
২০০১–২০০৬ সময়কার সহিংসতা।
দুর্নীতি মামলার বিতর্ক।
ইতিহাস তাই তাঁকে একদিকে আপোষহীন নেত্রী, অন্যদিকে বিতর্কিত রাষ্ট্রনায়ক—দুই পরিচয়েই মনে রাখবে।
উপসংহার
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা নানা বাঁক, নানা সংগ্রাম, সাফল্য ও বিতর্কে পূর্ণ। তবে একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না— তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, আপোষহীন এবং প্রজন্ম-নির্ধারণকারী নারী।
আর এই কারণেই তাঁকে অনেকেই ইতিহাসের এক “আপোষহীন নারী বিপ্লব” বলে অভিহিত করেন।