শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
খুলনা আর্ট একাডেমির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি অর্জনে গর্বিত প্রতিষ্ঠান মানবিকতার আলোকবর্তিকা স্পেশাল ব্রাঞ্চের মানবিক সাব-ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে ক্লাসিক চেস্ ক্লাবের সম্মাননা কবিতাঃ জীবন কবিতা নিয়ামতপুরে সরস্বতী পূজা উদযাপিত জগন্নাথপুরে গণভোটের পক্ষে উৎসাহিত করলেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক গ্রেটার ইসরায়েল শখ মুছে গেলো! জগন্নাথপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের গণসংযোগ, ভোটারদের ব্যাপক সাড়া বিদ্যুৎ ফাউন্ডেশন: মানবতার আলোর পথে ধানের শীষে ভোট দেয়ার আহবান শোডাউনের মধ্যদিয়ে প্রচারণা শুরু করলেন তুহিন মোরেলগঞ্জে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত ভিপিকে গণসংবর্ধনা, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন- অধ্যক্ষ আব্দুল আলীম

প্রবন্ধঃ শেকড় ছেঁড়া সুখের মরিচিকা

Coder Boss
  • Update Time : রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৭ Time View

কলমেঃ ইরি অতনু

একসময় বাঙালি সমাজ মানেই ছিল উঠানভরা হাসি, হাড়িকেন জ্বালিয়ে গল্প আর দাদী-নানীর আঁচলধরা শৈশব। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং তথাকথিত ‘আধুনিকতা’র চাপে সেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে বিয়ের পর ছেলেও যেমন মা-বাবার দায়িত্ব নিতে হিমশিম খাচ্ছে, তেমনি নববধূর মাঝেও গড়ে উঠছে এক ধরনের ‘স্পেস’ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে শিক্ষা, অর্থনীতি এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। দোষ কি সময়ের নাকি আমাদের?

অনেকেই বর্তমান সময়কে দোষারোপ করেন। কিন্তু সময় নিজে চলে না, মানুষ সময়কে চালায়। দোষ মূলত আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং শিক্ষার ভুল ব্যাখ্যার। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ক্যারিয়ার গড়তে শেখালেও ‘মানুষ’ হতে বা সম্পর্কের যত্ন নিতে শেখাচ্ছে না।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ আধুনিক ছেলে-মেয়েরা মনে করে সুখ মানেই হচ্ছে স্বাধীনতা। তারা মনে করে শ্বশুর-শাশুড়ি বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে থাকা মানেই হলো নিজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
​অর্থনৈতিক অস্থিরতা শহুরে জীবনের আকাশচুম্বী ব্যয় এবং ছোট ফ্ল্যাট কালচার মানুষকে একা থাকতে বাধ্য করছে।

ছেলের বউ এককভাবে থাকতে চায়, আর ছেলেও অনেক সময় পরিস্থিতির চাপে বা স্ত্রীর চাপে তাতে সায় দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কি আদৌ সুখ পাচ্ছে?
বাস্তবতা হলো, একা থাকাতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদী ‘সুখ’ নেই। মানুষ সামাজিক জীব। একা থাকা মানে হলো নিজের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। যখন একটি পরিবারে দাদা-দাদী থাকে না, তখন সেই ঘরের শিশুরা নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হয়। একা থাকার ফলে মানুষ আরও বেশি বিষণ্ণতা (Depression) এবং একাকীত্বের শিকার হচ্ছে। প্রযুক্তির ভিড়ে আমরা ‘কানেক্টেড’ থাকলেও আত্মিকভাবে আমরা প্রচণ্ড একা।

​পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই বাবা-মায়ের সেবাকে সর্বোচ্চ ইবাদত বা পুণ্য হিসেবে গণ্য করেছে। ইসলাম ধর্মে মা-বাবার সন্তুষ্টিতে স্রষ্টার সন্তুষ্টির কথা বলা হয়েছে। সনাতন ধর্মেও পিতামাতাকে দেবতার আসনে বসানো হয়েছে। অথচ আধুনিক সমাজে শিক্ষিত হয়েও আমরা এই মৌলিক শিক্ষাগুলো ভুলে যাচ্ছি।
মানবিকতা আজ কেবল সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ। যে ছেলেটি বা মেয়েটি নিজের জন্মদাতা পিতামাতাকে বোঝা মনে করছে, তারা ভুলে যাচ্ছে যে কালক্রমে তারাও বার্ধক্যে উপনীত হবে। এটি একটি চক্র (Cycle), যা আজ আপনি রোপণ করবেন, কাল তা-ই ফল হিসেবে পাবেন।

​বর্তমান সময়ে ‘প্রেম’ বিষয়টিও অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। বিয়ের আগে যে প্রেমের টান থাকে, বিয়ের পর তা দায়িত্বের চাপে ফিকে হয়ে যায়। প্রেমের সংজ্ঞায় এখন কেবল ‘আমি এবং তুমি’ প্রাধান্য পায়, সেখানে ‘পরিবার’ বা ‘সমাজ’ স্থান পায় না। অথচ সত্যিকারের প্রেম সেটিই যা দুই পরিবারকে মেলাতে পারে। শ্বশুরবাড়ির লোকেদের আপন করতে না পারাটা মানসিক সংকীর্ণতারই বহিঃপ্রকাশ।
​প্রবীণদের করুণ দশা ও সামাজিক সংকট
​এই আধুনিক সমাজব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রবীণরা। সারা জীবন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে সন্তানকে মানুষ করার পর, শেষ বয়সে তারা পাচ্ছেন ‘বৃদ্ধাশ্রম’ অথবা নিজ বাড়িতেই ‘একাকীত্ব’।
​মানসিক যন্ত্রণা: নিজের বাড়িতেই তারা আজ মেহমানের মতো। কথা বলার লোক নেই, অসুখে সেবা করার কেউ নেই।
​মর্যাদাহানি: শিক্ষিত সমাজব্যবস্থায় প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে এখন ‘পুরানো ধ্যান-ধারণা’ বলে অবজ্ঞা করা হয়।
​চিন্তা ভাবনার জাগরণ: আমাদের করণীয়
​আমাদের বুঝতে হবে যে, একা থাকা মানেই উন্নতি নয়।
বউকে যেমন শাশুড়ির ভুলগুলো ক্ষমা করতে শিখতে হবে, তেমনি শাশুড়িকেও বউকে নিজের মেয়ের মতো গ্রহণ করার মানসিকতা রাখতে হবে।

এখানে ছেলের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাকে মা এবং স্ত্রীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কাউকে বাদ দিয়ে নয়, বরং সবাইকে নিয়ে চলাই হলো পৌরুষত্ব।

কেবল সার্টিফিকেট নয়, পারিবার ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা ঘর থেকে শুরু করতে হবে।

​পরিবার পরিজন বাদে একা থাকাতে কখনোই প্রকৃত সুখ পাওয়া সম্ভব নয়। সুখের সন্ধান মেলে ত্যাগে, ভোগে নয়। গাছ যেমন শেকড় ছাড়া বাঁচতে পারে না, মানুষও পরিবার ছাড়া পূর্ণতা পায় না। আমাদের শিক্ষিত সমাজকে আজ নতুন করে ভাবতে হবে—আমরা কি কেবল টাকা উপার্জনের মেশিন হচ্ছি, নাকি একজন মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ? প্রবীণদের শেষ বয়সটা যেন অবহেলায় না কাটে, আর নবীনদের সংসার যেন স্বার্থপরতার বিষে নীল না হয়, সেটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102