
কলমে: শিরিনা আক্তার
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, মানবিক মর্যাদা ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জমে ওঠা মানুষের প্রতিবাদ ১৯৭১ সালে বিস্ফোরিত হয়েছিল স্বাধীনতার অগ্নিশিখায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “বাঙালি জাতি স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে জানে,” আর সেই বিশ্বাসই একটি জাতিকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আপসহীন অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তিকে অটুট করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে সাহসী নেতৃত্ব দেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠের মাধ্যমে জাতিকে প্রতিরোধের দিকনির্দেশনা দেন। মওলানা ভাসানী শোষণমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নে গণমানুষকে জাগ্রত করেন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানান। নয় মাসের এই সংগ্রাম আমাদের শিখিয়েছে—সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকলে ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না।
কবি সুফিয়া কামাল লিখেছিলেন, “এক নদীর রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি স্বাধীনতা,”—এই পংক্তি মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত বাস্তবতা ও শহীদদের আত্মত্যাগকে চিরদিন স্মরণ করিয়ে দেয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. মুনীর চৌধুরী বলেছিলেন, “স্বাধীনতা মানবতার চিরন্তন অধিকার,” অথচ সেই মানবতার আলোকবর্তিকাদেরই ১৪ ডিসেম্বর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শহীদুল্লাহ কায়সার, আলীম চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর রক্তে রঞ্জিত সেই দিন আমাদের ইতিহাসের গভীরতম বেদনাকে বহন করে।
কবি শামসুর রাহমান উচ্চারণ করেছিলেন, “স্বাধীনতা তুমি,”—কারণ স্বাধীনতা কেবল একটি রাষ্ট্রের নাম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও মানবিক অস্তিত্বের প্রতীক। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের দিন, কিন্তু এই বিজয় আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বেরও স্মারক। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন—এই সত্য উপলব্ধি করেই আমাদের পথ চলতে হবে।
বাংলাদেশ হবে একটি সাম্যবাদী ও মানবিক দেশ—যেখানে থাকবে না হিন্দু-মুসলমান বিভেদ, থাকবে না নারী-পুরুষ বৈষম্য, থাকবে না হিংসা ও রক্তারক্তি। সোনার বাংলায় আবার সোনার ফসল ফলবে, সোনার ছেলেমেয়েরা ঘরে ফিরে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবে, মুক্ত হাসি হাসবে। শিশুরা স্বাধীনভাবে যাবে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
রক্তের বদলা রক্ত নয়—প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা, মানবতার আদর্শ ও নৈতিকতার আলোয় গড়ে উঠবে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশ। আমরা যদি অতীতের ভুলগুলো সৎভাবে স্বীকার করে তা শুধরে নিতে পারি, তবে ইতিহাস আগামী প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাবে। ইতিহাসবিদদের দায়িত্ব হবে সত্য ও মানবিকতার আলোয় সমাজকে দিকনির্দেশনা দেওয়া। এই নতুন বছর আমাদের নতুন করে সেই পথই দেখাক—যে পথে মানুষ ভালোভাবে বাঁচবে, ভালো কাজ করবে, আর বাংলাদেশ আবারও বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।