
লেখকঃ শিরিনা আক্তার
নারী মানবসভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই সৃষ্টির ভার বহন করে এসেছে। সন্তান জন্মদান, পরিবার গঠন, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে নারী। অথচ ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় নারী অধিকাংশ সময়ই থেকেছে অবহেলিত, বঞ্চিত ও নীরব। যুগে যুগে সমাজ তাকে কখনো দুর্বল, কখনো গৃহবন্দি, আবার কখনো ভোগের বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তার কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছে কুসংস্কারের শেকলে, তার সম্ভাবনাকে বন্দি করা হয়েছে অজ্ঞতা ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের অন্ধকারে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় নারী ছিল নেপথ্যের শক্তি, কিন্তু স্বীকৃতি পেয়েছে সবচেয়ে কম। এই দীর্ঘ অবহেলার ইতিহাসই নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে আরও তীব্রভাবে সামনে এনে দাঁড় করায়।
প্রাচীনকাল থেকে আমাদের সমাজে কন্যাশিশুকে বোঝা মনে করা হতো। শিক্ষা, মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থেকে তাকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পর্দাপ্রথা ও অজ্ঞতার বেড়াজালে নারী যুগের পর যুগ আবদ্ধ থেকেছে। কুসংস্কারের কারণে নারীর মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতা সমাজের মূল স্রোতে যুক্ত হতে পারেনি। অথচ নারী মানবসমাজের অর্ধেক অংশ—তাকে উপেক্ষা করে কোনো পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। মহাত্মা গান্ধী যথার্থই বলেছেন, “নারী যদি পিছিয়ে থাকে, তবে সমাজ এক পায়ে খুঁড়িয়ে চলে।”
সময়ের পরিবর্তনে এই অমানবিক চিত্র ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। আর এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো নারীশিক্ষা। নারীশিক্ষাই কুসংস্কার ভাঙার প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। শিক্ষা নারীকে সচেতন করে, আত্মবিশ্বাসী করে এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান দেয়। শিক্ষিত নারী প্রশ্ন করতে শেখে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে এবং সমাজের প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাকে যুক্তির আলোতে চ্যালেঞ্জ জানায়। তাই নারীশিক্ষা কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানসিক মুক্তি ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ।
নারী শিক্ষিত হলে সে প্রথমেই একজন আদর্শ মা হিসেবে গড়ে ওঠে। মায়ের হাতেই সন্তানের চরিত্র, নৈতিকতা ও মানবিকতার বীজ রোপিত হয়। শিক্ষিত মা একটি আলোকিত প্রজন্ম উপহার দেয়, যা ভবিষ্যৎ জাতি গঠনের ভিত্তি। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যথার্থই বলেছেন, “আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব।” এই উক্তি প্রমাণ করে—নারীশিক্ষা একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের অন্যতম চাবিকাঠি।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নারীশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন— “হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে” (সূরা হুজুরাত)। হাদিসে বলা হয়েছে, “জ্ঞান অর্জন করা নারী-পুরুষ সকল মুসলমানের জন্য ফরজ।” বাইবেলে বলা হয়েছে, “জ্ঞানী নারী তার ঘর গড়ে তোলে” এবং মনুস্মৃতিতে উল্লেখ আছে, “যেখানে নারীর সম্মান হয়, সেখানে দেবতারা বাস করেন।” এসব বাণী সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—ধর্ম কখনোই নারীশিক্ষার বিরোধী নয়; বরং কুসংস্কারই নারীর অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়।
নারীশিক্ষা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। শিক্ষিত নারী কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়ে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে। কৃষি, শিল্প, গার্মেন্টস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উদ্যোক্তা খাতে নারীর অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। নারী আয় করতে পারলে পরিবারে দারিদ্র্য কমে, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় এবং সমাজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “যে জাতি নারীকে সম্মান দিতে জানে না, সে জাতি কখনো উন্নত হতে পারে না।”
অতএব কুসংস্কার ভেঙে নারীকে এগিয়ে আনতে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, সমান শিক্ষার সুযোগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা। নারীকে দয়া নয়, ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। তাকে করুণার চোখে নয়, সক্ষম শক্তি হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে—কন্যা ও পুত্রকে সমান মর্যাদা দিয়ে।
পরিশেষে বলা যায়, নারী জাগলে সমাজ জাগে, নারী শিক্ষিত হলে দেশ আলোকিত হয়। নারীশিক্ষা ও নারীসম্মান নিশ্চিত করাই একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের আগামীর পথ নির্মিত হওয়া উচিত।