
লেখক: মুসলিমা আক্তার
গত ২৪/০১/২৬ ইং তারিখে আগারগাঁও তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুসলিমা আক্তার, ৫ম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের উপর জুম প্লাটফর্মে বুক রিভিউ উপস্থাপন করেন। নতুন সংস্করণ -২০২৫ সেপ্টেম্বর এ প্রকাশিত বই ২০২৬ সালে সারা বাংলাদেশ মানসম্মত শিক্ষার উদ্যোগে সকল শিক্ষার্থীর দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। নতুন সংস্করণ বাংলাদেশে সংস্কারেরই অংশ হিসেবে শুরু হয়েছে শিক্ষকের দায়িত্ব ও শিক্ষার্থীর আনন্দ।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই হালনাগাদ করেছে। এর ফলে পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়েও কিছু বিষয়বস্তু, ভাষা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে।আগে ছবি ও বর্ণনায় একই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।কিছু ব্যক্তির ছবি, বর্ণনা বা প্রশংসা সংক্ষিপ্ত বা পরিবর্তিত হয়েছে।অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভূমিকা নতুনভাবে যুক্ত বা গুরুত্বসহকারে দেখানো হয়েছে।ভাষা আরও সহজ ও শিক্ষার্থী-বান্ধব করা হয়েছে। কিছু অধ্যায়ে হালনাগাদ উদাহরণ ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিল রেখে ব্যাখ্যা যোগ করা হয়েছে। আহে ভাষা, প্রশ্ন ও অনুশীলন ও প্রশ্ন ছিল মূলত মুখস্থনির্ভর।অনুশীলনের ধরন ছিল সীমিত।
নতুন সংস্করণে প্রশ্ন ও কাজগুলোতে ভাবনাশক্তি ও বিশ্লেষণের সুযোগ বেশি।দলগত কাজ, আলোচনা ও বাস্তবভিত্তিক প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছে।বইয়ের নকশা ও উপস্থাপনা এতোটাই চমৎকার যে একজন শিক্ষকের নতুন করে পাঠ পরিকল্পনা চিন্তা করতে হবে না। তবে পুরোনো সংস্করণে, পঞ্চম শ্রেণির নতুন সংস্করণের “বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়” বইটি মূল বিষয়বস্তু বজায় রেখেই হালনাগাদ করা হয়েছে। নিচে কয়েকটি অধ্যায়ের কিছু নতুন তথ্য আমার চোখে যা উঠে এসেছে তুলে ধরা হলো।
অধ্যায় – ০১ জলবায়ু পরিবর্তন
বর্তমানে নতুন সংস্করণে ১ম অধ্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন রাখা হয়েছে। ২০১১ সালের পরিবেশ পরিস্থিতি সমাজে নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে অধ্যায়টি ৮ নং এ ছিলো, ২০২৪ সালের এটি জলবায়ু ও দুর্যোগ নামে করা হয়েছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের মূল বিষয়ের আড়ালে পরিবর্তন কেন হচ্ছে অর্থাৎ কারণকে বোধগম্য করার সহজ পদ্ধতি গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি কি বা তথ্যবহুল আলোচনা আগের বই-এ দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ আগের বই-এ বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়ের তথ্যবহুল ছিল বর্তমানে সেটির কারণ ও নিরাপত্তার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
যা যা ভালো দিক:
১) বাস্তব জীবন ও নিরাপত্তার উপর জোড় দেয়া।
২) ছবি এমন ভাবে সংযুক্ত সহজেই বোধগম্য হবে।
৩) নির্দেশনার ছক ও সহজ পদ্ধতির প্রয়োগ।
৪) সৃজনশীলতার অভাব নেই বরং জীবন দক্ষতার প্রয়োগ রয়েছে।
অধ্যায় – ২ (আমরা মানুষ)
এই অধ্যায়টি সম্পূর্ণ নতুন। তবে নামটি নতুন হলেও বিষয়বস্তু পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ।
আগের সমাজ বই-এ সাধারণত পরিবেশ, মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব এভাবে সাজানো ছিল। কিন্তু নতুন সংস্করণে আমরা মানুষ অধ্যায়ে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষের কথা বলা হয়েছে।
ভালো দিক সমূহঃ
১) বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু বা শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ এটি।
২) শিক্ষার্থীদের সমতা ভিত্তিক শিখন পরিবেশের গুরুত্ব।
৩) মিলে মিশে খুব সহজেই স্বাভাবিক জীবন যাপনে সুবিধা হবে।
৪) বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুকে বাঁকা চোখে দেখার কোন সুযোগ নেই বরং তাদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
৫) সাধারণ শিক্ষার্থীরাও তাদের সাথে মিশে নৈতিক ও মানবিক হতে পারবে সহজে।
৬) সমতা ভিত্তিক শিখন পরিচর্যা কিভাবে করবেন শিক্ষকদের জন্য সহজ করে দেয়া হয়েছে। দল, গ্রুপ ওয়ার্ক, সামাজিক কাজ, একসাথে খেলা ইত্যাদি।
আমরা এই ক্ষমতায় অনেকেই মনে করি স্বাভাবিক শিশুর হয়ত ক্ষতি হচ্ছে বরং এই অধ্যায়ে সমতাভিত্তিক মানে সকল শিশুর জন্য একই রকম গুরুত্ব বহন করছে।
অধ্যায় – ৩ (বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী)
এই অধ্যায়ে ১টি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো –
পুরানো সংস্করণে শিক্ষক কেন্দ্রিক এবং তথ্যবহুল শিক্ষার্থী কি শিখবে –
কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক এবং শিক্ষার্থী কীভাবে শিখবে, এটার উপর সংস্করণ।
পুরোনো সংস্করণে ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীদের উৎসব, পোশাক, খাবার তালিকা ভিত্তিক বর্ণনা তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত ও শিক্ষক কেন্দ্রিক ছিল। নতুন সংস্করণে পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা ইত্যাদি গল্প ও চিত্রসহ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য (নৃগোষ্ঠী) স্পষ্টভাবে যুক্ত শিক্ষার্থীকে নিজের এলাকার সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে তাদের লিখতে বলা হয়েছে।
মাইন্ড ম্যাপ গুলো এতো সুন্দর যে, শিক্ষার্থীদের সাথে সাথে শিক্ষক ও খুশি থাকবেন।
ছবি ও ছকের বিষয় গুলো এতো চমৎকার, শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই বিষয় গুলো আয়ত্ত করবে সাথে উপভোগ ও করবে। যেমন –
কিসের ছবি?
তারা কী করছেন?
তুলনা গুলো ও সুন্দর
ধারণা চিত্রটি আরও চমৎকার।
অধ্যায় – ৪ (আমাদের স্মরণীয় নেতা)
শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও মহান ব্যক্তিকে দিয়ে। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। একজন বাংলার বাঘের নামের সার্থকতা, অজানা বিষয় জানবে আনন্দের সাথে। এই স্মরণীয় নেতাদের অধ্যায়টি তথ্যবহুল সাথে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের শুরুতেই এসব গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সম্পর্কে জানলে—নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের একটা চেতনা জাগ্রত হবে বলে আমার মনে হয়েছে।
তালিকা ও মাইন্ডম্যাপটি খুবই সুন্দর করা আছে—এতে সহজে বুঝতে পারবে।
দ্বিতীয়ত—মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জীবনী থেকে ১টি নতুন ও বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে মিল রয়েছে এমন শব্দ—মজলুম জননেতা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকেই মজলুম বা নির্যাতিত মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয়ে নেতা হয়ে উঠছেন—এ বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
তৃতীয়ত্ব — হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া আছে,
যিনি সকল জাতি ও ধর্ম মানুষের অধিকার নিয়ে অনেক বেশি অবদান রেখেছেন।
L) ব্যক্তিগত সুনাম এড়িয়ে যারা স্মরণীয় তাদের মধ্যে তিনি একজন।
L) প্রশ্নোত্তর, ছক সবই চমৎকার।
৪র্থ — শেখ মুজিবুর রহমান।
আগে যেমন — নেতৃত্ব বিস্তারিত বর্ণনা ছিল এখন সংক্ষিপ্ত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
L) এখানে অনুশীলন র গ নং মিলকরণটিতে শিক্ষার্থীরা সার্থক ধারণা নেবে।
অধ্যায়- ৫ (আমাদের মুক্তিযুদ্ধ)
> একাধিক ছবি, ব্যক্তি, ছক, দেয়ালিকা, জাতীয় দিবস ইত্যাদি বিষয়গুলোর সংযোজন চমৎকার। যা আমরা আশা করি।
> পার্থক্য আছে – বেশ চমৎকার ভাবে।
> পেজ – ৫৪ (চমৎকার)
> জাতীয় দিবস – পেজ – ৫৭ ভীষণ সুন্দর।
অধ্যায়-৬, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান ও নিদর্শন
তথ্য পরিবর্তন কম হলেও
ছবির পরিবর্তন চমৎকার
নিদর্শন পরিষ্কার
প্রত্নতাত্ত্বিক ছবি গুলো পরিষ্কার
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি ও সহজ শিখন পদ্ধতি দেয়া হয়েছে ছক ও কাজের মাধ্যমে।
এছাড়া মোট ১৬ টি অধ্যায়ের মোট ১৬০ পৃষ্ঠার বর্ননা শিক্ষার্থীদের মূল ধারনা হবে বলে আমি ছোট্ট শিক্ষক মনে করি।