বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
সি ইউ সি খুলনা কর্তৃক সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ঈদ বস্ত্র বিতরণ ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত খুলনা মেট্রোপলিটন শ্যুটিং ক্লাবের দোয়া ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত মানিকগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়িদের পাশে সাত্তার ফাউন্ডেশন অবরোধ থেকে আলোর পথে নরসিংদীর শিবপুরে গনহত্যা ও স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত ডিমলায় উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভা: তিস্তা থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ গোয়াইনঘাটে দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও ফায়ার সার্ভিসের মহড়া কবিতাঃ অগোছালো সংলাপ ভৈরবে দরিদ্র পরিবারের মাঝে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন মো. শরিফুল আলম তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ দ্রুত আইন করার দাবিতে ২০ হাজার নাগরিকের আবেদন

অবরোধ থেকে আলোর পথে

Coder Boss
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬
  • ৭ Time View

কলমেঃ শিরিনা আক্তার

বাংলা সমাজের ইতিহাসে এমন কিছু নারী আছেন, যাদের জীবন ও সংগ্রাম শুধু একটি সময়কে নয়, বরং বহু প্রজন্মকে আলোকিত করেছে। সেই মহীয়সী নারীদের মধ্যে অন্যতম হলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি শুধু একজন লেখক নন, তিনি ছিলেন নারী জাগরণের এক অগ্রদূত, সমাজসংস্কারক এবং শিক্ষাবিদ। নারীর শিক্ষা, অধিকার ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তিনি যে সাহসী অবস্থান নিয়েছিলেন, তা তাঁর সময়ের সমাজে ছিল এক বিপ্লবের সূচনা।

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বেগম রোকেয়া। তাঁর পরিবার ছিল রক্ষণশীল মুসলিম পরিবার। সে সময় মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। মেয়েদের জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়া বা শিক্ষা অর্জন করা সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হতো। কিন্তু সেই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তাঁর বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের গোপনে তাঁকে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা দেন। সেই শিক্ষা পরবর্তীকালে তাঁর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

পরবর্তীকালে তাঁর বিয়ে হয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতা বেগম রোকেয়ার চিন্তার জগৎকে আরও প্রসারিত করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, নারীর উন্নয়ন ও মুক্তির একমাত্র পথ হলো শিক্ষা। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এবং নারীদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে তিনি ১৯১১ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। সেই সময় সমাজের অনেক রক্ষণশীল মানুষ মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর বিরোধিতা করলেও তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর কাজ চালিয়ে যান।

বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন শক্তিশালী লেখকও। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে সমাজের অসাম্য, নারীর অবস্থা এবং মুক্তির স্বপ্ন। তাঁর বিখ্যাত রচনা “সুলতানার স্বপ্ন” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কল্পবিজ্ঞানধর্মী গল্প। এই গল্পে তিনি এমন এক সমাজের কল্পনা করেন যেখানে নারীরা শিক্ষিত, স্বাধীন এবং নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত, আর পুরুষরা গৃহবন্দী। এই রচনার মাধ্যমে তিনি সমাজের প্রচলিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ করেছেন।

এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে “মতিচুর”, “পদ্মরাগ”, “অবরোধবাসিনী” ইত্যাদি। এসব লেখায় তিনি নারীদের উপর সামাজিক অবরোধ, অশিক্ষা এবং কুসংস্কারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছিলেন—
“কারাগারে বন্দীরা লৌহ নির্মিত বেড়ি পরে, আর আমরা নারীরা স্বর্ণ-রৌপ্যের বেড়ি পরি।”
এই কথার মধ্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, বাহ্যিক অলংকারের আড়ালেও নারীরা এক অদৃশ্য বন্দিত্বে আবদ্ধ।

বেগম রোকেয়ার জীবন ছিল সংগ্রামময়। তিনি নারীশিক্ষা ও অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে তৎকালীন সমাজের অনেক গোঁড়া মানুষের বিরোধিতার সম্মুখীন হন। তবুও তিনি থেমে যাননি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—নারী যদি শিক্ষিত হয়, তবে সমাজও আলোকিত হবে।

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর জন্মদিন এবং মৃত্যুদিন একই তারিখে—৯ ডিসেম্বর। বলা হয়, মৃত্যুর আগের রাতেও তিনি নারীর অধিকার বিষয়ক একটি প্রবন্ধ লিখে শেষ করেছিলেন। তাঁর শয্যার পাশে সেই লেখা খোলা অবস্থায় পড়ে ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নারীমুক্তির স্বপ্নে কাজ করে গেছেন।

তাঁর মৃত্যুর পরেও নানা সামাজিক বাধা ও বিতর্ক দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত কলকাতার উপকণ্ঠে সোদপুর পানিহাটিতে গঙ্গার ধারে তাঁকে সমাহিত করা হয়। দীর্ঘদিন তাঁর কবরের অবস্থান অনেকের কাছেই অজানা ছিল। পরে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের প্রচেষ্টায় তাঁর সমাধির স্থান চিহ্নিত করা হয়। শ্বেতপাথরে বাঁধানো সেই সমাধিতে লেখা আছে যে তিনি স্ত্রী শিক্ষা ও নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।

মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি তাঁর এক ছাত্রীকে বলেছিলেন—
“কবরে শুইয়া শুইয়াও যেন আমি মেয়েদের কলকোলাহল শুনতে পাই।”
এই কথার মধ্যে লুকিয়ে ছিল তাঁর আজীবনের স্বপ্ন—নারীরা যেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয় এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

আজ তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। নারীরা আজ শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবুও সমাজে এখনও বৈষম্য, কুসংস্কার এবং নারীর প্রতি নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। অনেক নারী আজও অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও সামাজিক চাপে নিজেদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারে না।

তাই বেগম রোকেয়ার জীবন আমাদের শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি দেখিয়ে গেছেন, সাহস, শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে সমাজের কঠিন দেয়ালও ভেঙে দেওয়া সম্ভব।

আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর শিক্ষা স্পষ্ট—শিক্ষা মানে শুধু সনদ অর্জন নয়; শিক্ষা মানে মুক্ত চিন্তা, মানবিকতা এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া। নারীর প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হবে।

বেগম রোকেয়া আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম আমাদের পথ দেখাক, আমাদের সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক করে তুলুক।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Coder Boss
Design & Develop BY Coder Boss
themesba-lates1749691102