
মো: আব্দুল আজিজ
রড-সিমেন্টের বড় কোম্পানিগুলো যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি টন রডের দাম ছয় থেকে সাত হাজার টাকা এবং প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে যারা বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। উদ্বেগ রয়েছে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আবাসন খাত ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, মাসখানেক আগে থেকেই ধীরে ধীরে রড-সিমেন্টের দাম বাড়ছিল। তবে সপ্তাহখানেক ধরে কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া ট্রাকভাড়াও বেড়ে গেছে। এ কারণে দাম বেশ বাড়তি।
রড-সিমেন্টের উৎপাদনকারীরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিকবাজারে রড-সিমেন্টের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ডিজেলের কৃত্রিম সংকটও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রয়েছে গ্যাসের স্বল্পতাও। এতে উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তাছাড়া ট্রাক সংকটে কারখানা থেকে ডিলার পর্যায়ে রড ও সিমেন্ট পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। তবে ক্রেতা ও আবাসন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংকটকে পুঁজি করে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে উৎপাদনকারীরা। সরকারের উচিত উৎপাদন ও কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে খবরদারি করা। আমি মনে করি, যথাযথ বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার অজুহাতে বড় কোম্পানিগুলো দ্রুত দাম বাড়িয়ে দিলেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল চট্রপ্রামের কয়েকটি খুচরা দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভালো ব্র্যান্ডের প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৯৪ থেকে ৯৬ হাজার টাকায়, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৮৫ থেকে ৮৬ হাজার টাকা। এছাড়া তুলনামূলক কম পরিচিত ব্র্যান্ডের রডের টন যুদ্ধ শুরুর আগে ৮১ থেকে ৮৩ হাজার টন বিক্রি হলেও এখন কিনতে লাগবে কমবেশি ৯০ হাজার টাকা।
রড ব্যবসায়ীরা বলেন, এক মাস ধরে রডের দাম পাঁচশ-এক হাজার করে বাড়ছে। তবে যুদ্ধ লাগার পর কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে এক সপ্তাহের মধ্যেই টনপ্রতি ছয়-সাত হাজার টাকা বাড়িয়েছে। এছাড়া ডিজেল সংকটের কারণ দেখিয়ে ট্রাকের ভাড়াও বেড়েছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।
সিমেন্টের বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর জ্বালানি সংকটের অজুহাতে সিমেন্টের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিমেন্টের বস্তায় বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। যেমন, দুই সপ্তাহ আগে ফ্রেশ ব্র্যান্ডের সিমেন্টের বস্তা কেনা গেছে ৪৮০ থেকে ৪৯০ টাকায়। এখন কিনতে খরচ হবে ৫০০ থেকে ৫১০ টাকা। এভাবে প্রায় সব ধরনের সিমেন্টের দাম বেড়েছে। পূর্ব তেজতুরি বাজারের সিমেন্ট ব্যবসায়ী গুডনেস সাপ্লাই কোম্পানির স্বত্বাধিকারী নুর উদ্দিন আহমেদ বলেন, যুদ্ধের কারণ দেখিয়ে কোম্পানিগুলো সিমেন্টের বস্তায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বাড়িয়েছে। ট্রাক মালিকরাও ভাড়া বাড়িয়েছেন। সেজন্য খুচরা পর্যায়ে সিমেন্টের দর বাড়তি।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) মহাসচিব ড. সুমন চৌধুরী সমকালকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাজারে। গত ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে রড উৎপাদনের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের প্রতি টনে ৫০ থেকে ৬০ ডলার দর বেড়েছে। বেড়েছে জাহাজভাড়াও। এ ছাড়া দেশে ডিজেলের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বেড়ে গেছে পরিবহন ভাড়া। অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহের স্বল্পতার কারণে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে দেশে ডিজেলের ব্যাপক সংকট দেখা দিতে পারে। তাতে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিসহ সব কিছুর দাম বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়তে পারে রডের দামে।
সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা জানান, সিমেন্ট তৈরিতে পাঁচ ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়। ক্লিংকার, জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশ। এগুলোর বেশির ভাগ আমদানিনির্ভর। সবচেয়ে বেশি আমদানি ও ব্যবহৃত হয় ক্লিংকার। চুনাপাথরের সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে উচ্চতাপে ক্লিংকার তৈরি হয়।
যুদ্ধের রেশ এসব কাঁচামালেও পড়েছে। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) নির্বাহী সদস্য ও ডায়মন্ড সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল খালেক বলেন, গত কয়েক দিনে আমদানি পর্যায়ে প্রতি টন ক্লিংকারের দাম ১০ থেকে ১২ ডলার বেড়েছে। জিপসাম, স্ল্যাগ, চুনাপাথর ও ফ্লাই অ্যাশ প্রতিটি কাঁচামালের দাম ৮-১০ ডলার করে বেড়েছে। তিনি বলেন, যেমন কাঁচামালের দাম বেড়েছে তেমনি গ্যাসের সংকটও বাড়ছে। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচও বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যে।
এভাবে রড-সিমেন্টের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে নির্মাণ খাতে। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, রড ও সিমেন্টের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে নির্মাণাধীন বহু প্রকল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যেতে পারে। তাছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে বাড়ি করার পরিকল্পনা থেকেও অনেকে পিছিয়ে যাবেন। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি যথাযথ কিনা সেই বিষয়ে রিহ্যাব, এফবিসিসিআই, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এসব খাতের সংগঠনের সমন্বয়ে একটি তদারকি টিম গঠন করা উচিত।
লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন, সিটিজি ক্রাইম ও চ্যানেল কর্ণফুলী।