
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
মানুষের জীবন প্রতিদিনের কাজের ভিড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দায়িত্ব আর দুশ্চিন্তা মানুষকে অনেক সময় একাকী করে তোলে। উৎসব সেই ক্লান্ত জীবনে আনন্দের আলো জ্বালায়। উৎসব মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে। উৎসব হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়। মানুষ তখন প্রীতি বিনিময় করে। মানুষ তখন মিলনের আনন্দ অনুভব করে। ঈদ মুসলমানদের তেমনই এক মহৎ উৎসব।
ঈদ কেবল আনন্দের দিন নয়। ঈদ আত্মশুদ্ধির দিন। ঈদ সংযমের দিন। ঈদ সাম্যের দিন। ঈদ মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের দিন। এই উৎসব মানুষকে শেখায় যে পৃথিবীতে সব মানুষ সমান। ধনী গরিবের ভেদ নেই। জাতি ধর্ম বর্ণের ভেদ নেই। সকল মানুষ একই মানব পরিবারের সদস্য।
মুসলমানদের বছরে দুটি বড় ঈদ আছে। একটি ঈদ-উল-ফিতর। অন্যটি ঈদ-উল-আযহা। রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতর আসে। এই ঈদ আনন্দের। এই ঈদ সংযমের সাধনার পুরস্কার। আর জিলহজ মাসে আসে ঈদ-উল-আযহা। এই ঈদ ত্যাগের শিক্ষা দেয়। এই ঈদ আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয়।
রমজান মাস মুসলমানদের কাছে পবিত্র মাস। এই মাসে মানুষ রোজা রাখে। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকে। কিন্তু রোজার শিক্ষা শুধু উপবাস নয়। রোজা মানুষের মনকে সংযত করে। রোজা মানুষের ভেতরের অহংকার ভেঙে দেয়। রোজা মানুষকে অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখায়। ক্ষুধার অনুভূতি মানুষকে দরিদ্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।
রমজান মাসে রাতের নীরবতায় মানুষ প্রার্থনা করে। মানুষ কোরআন পাঠ করে। মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে। মানুষ নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চায়। এই মাস মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। এই মাস মানুষকে নতুন জীবনের শিক্ষা দেয়।
এই সাধনার শেষে আসে ঈদুল ফিতর। নতুন চাঁদ দেখা যায়। আনন্দের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের চোখে হাসি ফুটে ওঠে। মানুষ নতুন পোশাক পরে। সবাই ঈদের নামাজ পড়তে যায়। মসজিদ ও ঈদগাহ ভরে ওঠে মানুষের ভিড়ে। সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। কেউ ধনী নয়। কেউ গরিব নয়। সবাই শুধু মানুষ। সবাই এক আল্লাহর বান্দা। নামাজ শেষে মানুষ একে অপরকে আলিঙ্গন করে। সবাই বলে ঈদ মোবারক। সেই মুহূর্তে মানুষের মধ্যে বিভেদ থাকে না। মানুষ তখন শুধু ভ্রাতা। মানুষ তখন শুধু বন্ধু।
ঈদের অন্যতম শিক্ষা হলো দান। ঈদের আগে মুসলমানরা ফিতরা দেয়। এই দান দরিদ্র মানুষের জন্য। যাতে তারাও ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারে। ইসলাম চায় না কেউ ক্ষুধার্ত থাকুক। ইসলাম চায় না কেউ বঞ্চিত থাকুক।
ইসলামে যাকাতের বিধান আছে। যাকাত সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। ধনী মানুষের সম্পদের একটি অংশ দরিদ্র মানুষের অধিকার। এই দান সমাজে সাম্য আনে। এই দান মানুষের হৃদয়কে পবিত্র করে।
ইসলাম মানুষকে ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। নামাজ সেই ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। প্রতিদিন পাঁচবার মুসলমানরা একসঙ্গে দাঁড়ায়। তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রার্থনা করে। সেখানে কোনও শ্রেণি বিভাজন নেই। কোনো অহংকার নেই। এই দৃশ্য বিশ্বভ্রাতৃত্বের এক মহান উদাহরণ।
আজ পৃথিবী এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের আগুন অনেক দেশকে গ্রাস করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলেও বহুবার যুদ্ধের ধ্বংস দেখা গেছে। যুদ্ধ মানুষের ঘর ভেঙে দেয়। যুদ্ধ মানুষের জীবন নষ্ট করে। যুদ্ধ শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেয়। যুদ্ধ কখনো মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে না। যুদ্ধ মানুষের হৃদয়ে ঘৃণা জন্মায়। যুদ্ধ সভ্যতাকে পিছিয়ে দেয়।
ইসলাম যুদ্ধের ধর্ম নয়। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম ভালোবাসার ধর্ম। ইসলাম মানবতার ধর্ম। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো শান্তি। ‘ইসলাম’ শব্দের মধ্যেই শান্তির অর্থ নিহিত আছে। ইসলাম মানুষকে বলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে ঘৃণা শেখায় না। ইসলাম মানুষকে ধ্বংস শেখায় না। ইসলাম বলে পৃথিবী আল্লাহর সৃষ্টি। এই পৃথিবী সব মানুষের। তাই মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। মানুষকে শান্তি রক্ষা করতে হবে। মানুষকে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
ঈদ সেই শান্তির বার্তা বহন করে। ঈদ মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে ঘৃণা নয় ভালোবাসাই মানব জীবনের মূল শক্তি। ঈদ শেখায় ক্ষমা করতে। ঈদ শেখায় ভুলে যেতে। ঈদ শেখায় মিলনের পথ খুঁজতে। আজ যখন পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে যুদ্ধের অন্ধকার ছায়া দেখা যায় তখন ঈদের শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজন। ঈদের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ মানুষের শত্রু নয়। মানুষ মানুষের সহযাত্রী।
যদি ঈদের শিক্ষা আমরা সত্যিই গ্রহণ করি তবে পৃথিবী আরও সুন্দর হবে। দারিদ্র কমবে। ঘৃণা কমবে। যুদ্ধ কমবে। মানুষ একে অপরকে বুঝতে শিখবে।
ঈদ তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। ঈদ মানবতার উৎসব। ঈদ সাম্যের উৎসব। ঈদ সম্প্রীতির উৎসব। ঈদ বিশ্বভ্রাতৃত্বের উৎসব। এই পৃথিবীকে যদি শান্তির পৃথিবী করতে হয় তবে ঈদের চেতনাকে আমাদের জীবনে ধারণ করতে হবে। আমাদের সমাজে ধারণ করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্রে ধারণ করতে হবে।
তবেই সত্যিকার অর্থে ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পাবে। তবেই ঈদ হবে মানুষের মুক্তির উৎসব। তবেই ঈদ হবে শান্তির উৎসব। পৃথিবীর সব মানুষের জীবনে শান্তি আসুক। ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা আসুক। বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য আসুক। এই প্রার্থনাই হোক ঈদের প্রকৃত বার্তা।