
মোহাম্মদ মনজুর আলম অনিক
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বিড়ি টানিতে টানিতে মোমিন তন্দ্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়িল, হাতের বিড়িটা ফেলিয়া কখন যে ঘুমাইযা পরিল তাহার খেয়াল নাই। দূরে ঝিঝি পোকা গুলি ঝিঁঝি করিয়া শব্দ করিতে লাগিল,
রাত্রির প্রহর বাড়িতে লাগিল, মোমিন যেখানে ঘুমাইতেছিল তাহার অদূরে আম্র বৃক্ষ গুলি নিথর দাঁড়াইয়া তাহারাও যেন ঘুমাইতে ছিল। আম্র বৃক্ষের শাখায় ডাহুক পক্ষি গুলি হঠাৎ হঠাৎ ডাকিয়া উঠিতেছিল। ময়লা আবর্জনার মধ্য হইতে মশা গুলি আসিয়া মোমিনের কর্ণের কাছে ভো ভো শব্দ করিতেছিল কিছু মশা রক্ত চুষিয়া ঢোল হইতেছিল , সেই দিকে মোমিনের মোটেও খেয়াল নাই, মোমিন অঘরে নিদ্রা যাইতেছে।
সারাদিন প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার হাটিয়া আসিয়াছে,দেহ একেবারেই ভাঙিয়া চুরিয়া ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাহাই তাহার মশার দিকে মোটেও খেয়াল নাই। সুবোধ শিশুর ন্যায় ঘুমাইতেছে অঘোরে। এখন সে ভুলিয়া গিয়াছে উদরের ক্ষুধার কথা বাড়ির স্ত্রীর নির্মম বাক্যের নির্যাতন অত্যাচারের কথা দ্বন্দ কলহের কথা। ভুলিয়া গিয়াছে তাহার দুইটি ফুটফুটে শিশু সন্তানের কথা। এখন তাহার চোক্ষে শুধু ঘুম আর ঘুম নিদ্রা আর নিদ্রা। অপরিসীম নিদ্রা, ক্লান্ত নিদ্রা। এখন সে ভুলিয়া গিয়াছে সে তাহার স্বীয় স্ত্রীর সহিত সাতটা বৎসর ঘর সংসার করিয়াছে। যুগল সন্তানের পিতা হইয়াছে। এখন পুরোপুরি ভুলিয়া গিয়াছে সে কোন কালে ভালো মেধাবী ছাত্রদের মধ্যে সেরা মেধাবী ছাত্র ছিল। অনেক অনেক ছাত্র যেই সময় এলাহি কারবারে বসবাস করিয়া, তিন তিনবেলা উপযুক্ত সুষম খাদ্য ভক্ষণ করিয়া, বিস্তর সময় আরাম আয়েশ ভোগ করিয়া যেই রেজাল্ট আনিতে পারে নাই, মোমিন সেই রেজাল্ট আনিয়াছিল।সে ভুলিয়া গিয়াছে কখনো অনার্স পাশ করিয়া কখনো সেকায়েপ এ পাঁচ টা বৎসর চাকরি করিয়াছে। সেকায়েপ চাকরিটা ছিল বৈদেশিক প্রজেক্ট মাত্র। প্রজেক্ট শেষ হইয়া যাওয়াই তাহার চাকরি শেষ হইয়াছে।চাকরি শেষ হইয়া যাওয়াই সে পুরাপুরি বেকার হইয়া পরিয়াছিল আবার সেই পুরাতন কর্মক্ষেত্র কৃষিকার্য করিতে লাগিল। যখন সে চাকরি করিতেছিল দিনকাল ভালোই যাইতেছিল। বেকার হইয়া যাওয়াই পয়সা কমিয়া গেল আর সেই মুহূর্তে বিবাহও করিয়া ফেলিলো। বিবাহ করিয়া আরো দুঃখ দুর্দশা বাড়িয়া গেল, স্ত্রী যখন যেটা চাহিতেছে মোমিন সেইটা পূরণ করিতে পারিতেছে না, ফলত: পরিবারে দ্বন্দ কলহ বাড়িতে লাগলো, এক সময় স্ত্রীর পরামর্শে পিতা-মাতা হইতে আলাদা হইয়া গেল, আলাদা করিয়া সংসার করিতে লাগিল। আলাদা করিয়া সংসার চলিতে লাগিল কোন রকমে টানাটানি করিয়া। ইহার মাঝে আবার দুইটি সন্তান হইয়া গেল। সংসার আরো ভারী হইয়া গেল আরো জটিলতা বাড়িয়া লাগিল, স্ত্রী কথায় কথায় মোমিনকে গালমন্দ করিতে লাগিল অবহেলা বাড়িয়া গেল স্বামীর প্রতি। মোমিন শিক্ষিত ছেলে বলিয়া স্ত্রীর সকল বাক্যের চাবুক নিরবে সহ্য করিতে লাগিল, ঝগড়াঝাঁটি করিলে পাড়া-প্রতিবেশী মোমিনকে গো মূর্খ বলিবে এই ভাবিয়া গাল মন্দ চিবাইয়া চিবাইয়া খাইতে লাগিল, স্ত্রীর কথার কোন প্রতি উত্তর করিলো না প্রতিউত্তর করিলে ঝগড়া বাধিয়া যাইবে এই ভয়ে। নিজের জমি জমা নাই বলিয়া অপরের বাড়িতে কামলা খাটিতে লাগিল। কামলা খাটিয়া কয় টাকায় বা পাই ইহা দ্বারা টানাটানি করিয়া সংসার চালাইতেছিল।
মোমিন একবার ভাবিয়া ছিল এমন স্ত্রীর সহিত সংসার করিবার চাইতে একাকীত্ব জীবন অনেক ভালো। পাড়া-প্রতিবেশীরাও তো অনেকে কামলা খাটিয়া সংসার চালাইতেছে তাহাদের সংসারে তো কোন প্রকার দ্বন্দ্ব কলহ হয় না। তাহা হইলে মোমিনের সংসারে ঝগড়াঝাঁটি হইতেছে কেন? কেনই বা সে স্ত্রীর নিরব অত্যাচার সহ্য করিতেছে? একদিন দ্বিপ্রহরে মোমিনের স্ত্রী তাহার মেয়েটা কে সামান্য একটা কারণে জোরে একটা গালে থাপ্পর মারিয়া দিলো, মোমিন তাহা দেখিয়া সহ্য করিতে পারিল না।
বলিল -অযথা কেন মেয়েটাকে থাপ্পড় মারলে?
– মারবো না কেন, সারাদিন এত দুষ্টামি আর কানের কাছে ঘ্যানরঘ্যানর করে বা কেন?
মেয়েটা সামান্য মুড়ি চাহিতেছিল অথচ ঘরেই মুড়ি ছিল, গুটিকয়েক মুড়ি মেয়েটাকে দিলেই পারিত কিন্তু সে দেয় নাই কি জানি একটা ঘর কন্যার কাজে ব্যস্ত ছিল। মোমিনও দাওয়া হইতে নামিয়া স্ত্রীর গালে একটা থাপ্পড় বসাইয়া দিল। ইহাই জীবনের প্রথম সে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলিল। আর তাহাতেই বাঁধিয়া গেল লংকা কান্ড। স্ত্রী অশ্লীল আর বেফাঁস বেফাঁস গালি দিতে লাগিল মোমিনকে। মোমিন সহ্য করিতে না পারিয়া স্ত্রীকে আরো কয়েকটা চপেটাঘাত করিল। ইহাতে গোস্ব্যা হইয়া স্ত্রী পোটলা পুটলি বাঁধিয়া বাপের বাড়ি কাঁদিতে কাঁদিতে যাইয়া উঠিল। মোমিনের স্ত্রীর নাম জয়নব আখতার আঁখি। আঁখি বলিয়ায় সবাই তাহাকে ডাকে, আঁখি আঁখি বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে জয়নাব আক্তার চাপা পরিয়া গিয়াছে। আখির পিতা মাতা ঘটনা বিশদ শুনিয়া আঁখির পক্ষ হইল। এইভাবে কিছুদিন কাটিয়া গেল, মোমিনের পিতা আঁখিকে ঘরে লইবার জন্য আখিদের বাড়িতে গেল। বিয়াই মশাইকে বসাইয়া কহিল- দেখেন বিয়াই মশাই আমরা তো আলাদা খায়, আর আপনার মেয়ে জামাই তো আলাদা খাই আলাদা রান্নাবান্না করে।
কেন যে ওদের ভেতর এতদ্বন্দ্ব কলহ আমি নিজেও বুঝিনা বিয়াই?
তো যা হোক আমি বৌমাকে ঘরে নিতে এসেছি। নাতি নাততিরা আছে সংসার হয়ে গেছে, লোকজনে খারাপ বলবে। আমি বৌমাকে নিয়ে যাই কি বলেন?
– বিয়াই আপনার সম্বন্ধে আমার মেয়ে কোন খারাপ কিছু বলেনি। যত নষ্টের গোড়া আপনার ছেলে এত সহজে আমি আমার মেয়েকে আপনার ওখানে পাঠাবো না। দেখেন বিয়াই আমি মেম্বার চেয়ারম্যান কে ডাকবো বিচার সালিশ করে তারপরে পাঠাবো।
মোমিনের পিতা নাতি নাতনিদের দেখিয়া কিছু মিষ্টান্ন লইয়া গিয়াছিল তাহা তাহাদের হস্তে দিয়া স্বগৃহে ফিরে আসিল। কোন দিন মেম্বার চেয়ারম্যান ডাকিয়া সালিশ করিবে তাহা নাকি বিয়াই মশাই কে জানাইয়া দিবে। মনঃক্ষুন্ন হইয়া মোমিনের পিতা গৃহাভিমুখি হইল।গৃহে ফিরিবার সময় অজান্তেই নয়নে অশ্রু আসিয়া পরিল।
” হায় আমার সোনার সন্তান! ছেলেটা গো বেচারা আমার, কারো সাথে হাই ঝায় নাই, ঝগড়াঝাটি নাই বাদ প্রতিবাদ নাই। শিশুকাল থেকে তাকে আমি মানুষ করেছি। কতইনা ভালো, ছেলেটা আমার!
এত ভদ্র এত নম্র এতো ভালো আচরণের ছেলে, হয়তো ভাগ্য করেই পেয়েছি স্বয়ং মহান আল্লাহ তাবারক ওয়া তায়ালা আমাকে দান করেছেন। আমি গরিব বলে আমার ছেলে আমাকে কখনো বাড়তি চাপ দেয়নি।পাড়া-প্রতিবেশীদের অন্য ছেলেদের মত দুষ্ট ছেলেও নয় বটে। প্রতিবেশীদের ছেলেরা যখন মাঠে খেলতো তখন আমার ছেলে ঘরে ঢুকে পড়াশোনা করতো। কতবার বলেছি বাবা একটু বাইরে গিয়ে খেলাধুলা কর মাথা খারাপ হয়ে যাবে বাবা, ছেলে আমাকে বলতো বাবা পড়াশোনা না করলে চাকরি পাবো কিভাবে বাবা? আমাকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে, ভালো চাকরি পেতে হবে বাবা। দেখছো না আমরা কত গরীব, আমি চাকরি করে আমি আমাদের সংসারটাকে অতি উন্নত সংসার করবো বাবা। তোমাকে অনেক অনেক টাকা দেবো বাবা আমি একটা ভাল চাকরি পেয়ে নিই।
গৃহে ফিরিবার সময় এইসব কথা ভাবিতে ভাবিতে গৃহে ফিরিতেছিল আর দুই নয়নে অশ্রু জল লইয়া নির্বাক কান্না কাঁদিতে কাঁদিতে গৃহে ফিরিতেছিল। কাঁচা রাস্তা তাহাই হাঁটিয়া হাঁটিয়া গৃহে ফিরিতেছিল। সময়টা ছিল বৈকাল বেলা তাহায় অনেক লোকজন কাঁচা রাস্তা ধরিয়া চৌরঙ্গী বাজারে যাইতেছিল।কেহ কেহ কেহ হয়তো মোমিনের বাপের চক্ষু জল দেখিয়া ফেলিয়াছিল। কেহ কেহ হয়তো মনে মনে ভাবিতেছিল আহা লোকটা কতই না দুঃখী! কতই না দুঃখে রহিয়াছে লোকটা তাহাই কান্না সংবরণ করিতে না পারিয়া পথে হাঁটিতে হাঁটিতে কাঁদিতেছে। অথচ এই মুমিনের পিতা মমিন কে লইয়া একদিন বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়াছে, ছেলে তাহার বিরাট বড় হইবে, বিরাট বড় দামি মানুষ হইবে
বিরাট বড় চাকরি করিবে। কিন্তু সেই ছেলে আজ নিজেই কাঁদিতেছে এবং পিতাকেও কাঁদাইতেছে। চলবে…